খেলা শেষ, হেরেও কেপ ভার্দে ইতিহাসের পাতায়…।

খেলা শেষ, হেরেও কেপ ভার্দে ইতিহাসের পাতায়…।

Spread the love

আর্জেন্টিনা: ৩ (মেসি, লিসান্দ্রো, ডিনে আত্মঘাতী)

কেপ ভার্দে: ২ (ডুয়ার্তে, কাব্রাল)

 

কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার  : কলকাতা, ৪ জুলাই, ২০২৬। কখনও কখনও ফুটবলের সবচেয়ে সুন্দর গল্পটা বিজয়ীদের নয়, পরাজিতদের লেখা। স্কোরবোর্ডে শেষ পর্যন্ত জয়ী দলের নামই ইতিহাসে, কিন্তু কিছু হার কোটি মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয় ! কারণ সেই হার আত্মসমর্পণের নয়, লড়াইয়ের। সেই হার বলে—”হারতে পারি, কিন্তু ভেঙ্গে পড়ব না। শেষ বাঁশি বাজার আগে মাথা নত করব না।” যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ !

ফিফা বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াইয়ে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে কেপ ভার্দের ম্যাচটা ছিল ঠিক তেমনই এক গল্প। শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলে জিতে শেষ ষোলোয় জায়গা লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার। সেখানে প্রতিপক্ষ মিশর, ইতিমধ্যেই টাইব্রেকারে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে শেষ ষোলোয়। কিন্তু মায়ামির মাঠে ম্যাচ শেষে আলো আর্জেন্টিনার জয়ের থেকে কম নয় কেপ ভার্দের অবিশ্বাস্য লড়ায়ের ওপর।

মাত্র সাড়ে পাঁচ লক্ষ মানুষের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে এদিন দেখিয়ে দিল, ফুটবলে বড় নাম আর বড় দেশই সব নয়। সাহস, আত্মবিশ্বাস আর অদম্য মানসিকতা থাকলে বিশ্বের সেরা দলকেও কাঁপিয়ে দেওয়া যায়। তারা হেরেছে ঠিকই, কিন্তু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের নিঃশ্বাস আটকে রেখেছিল।

আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি প্রত্যাশামতো প্রথম একাদশে রেখেছিলেন লিওনেল মেসি, লাউতারো মার্টিনেজ ও থিয়াগো আলমাডাকে। ৪-২-২ ছকে লাউতারো ও মেসিকে রাখা হয়েছিল স্ট্রাইকার হিসেবে। অন্যদিকে কেপ ভার্দে শুরু থেকেই সাতজন ফুটবলারকে রক্ষণে রেখে কার্যত ‘পার্ক দ্য বাস’ কৌশল নেয়। ফলে আর্জেন্টিনার উইং আক্রমণ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। আলমাডা নিজের ছন্দ খুঁজে পাননি, সহজ পাসেও ভুল করেছেন। অন্য প্রান্তে রদ্রিগো ডি’পলও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি। মেসি ও লাউতারোর বোঝাপড়াও খুব একটা জমেনি। ফলে আর্জেন্টিনা বলের দখল রাখলেও কেপ ভার্দের ঘন রক্ষণ ভাঙ্গা সহজ হচ্ছিল না।

তবে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছিলেন কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সি গোলকিপার ভোজিনহা ! আত্মবিশ্বাস এতটাই, নিজের বক্সের মধ্যেই লাউতারো মার্টিনেজকে ড্রিবল করে বেরিয়ে আসেন তিনি ! গ্যালারিতে তখন তাঁর নামের জার্সি, তাঁর নামে স্লোগান। যেন একটি গোটা দেশের বিশ্বাসের প্রতীক তিনি। সামনে লিওনেল মেসি, তাও অকুতোভয় !

ম্যাচের প্রায় আধঘণ্টার মাথায় লিসান্দ্রো মার্টিনেজের নিখুঁত ক্রস কেপ ভার্দের বক্সে পৌঁছয়। মেসি অসাধারণ দক্ষতায় বাঁ-পায়ের প্রথম ছোঁয়াতেই বল নামিয়ে এক নিমেষে জড়িয়ে দেন জালে। ভোজিনহার কিছুই করার ছিল না। চলতি বিশ্বকাপে এটি ছিল মেসির সপ্তম গোল এবং বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা পৌঁছে যায় ২০ তে। প্রথমার্ধে খুব বেশি সুযোগ তৈরি না হলেও বলের দখল ও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্জেন্টিনার হাতেই।

কিন্তু বিরতির পর অন্য এক কেপ ভার্দে ! শুধু রক্ষণ নয়, এবার তারা চোখে চোখ রেখে লড়াই শুরু করল। বলের দখল ধরে একের পর এক আক্রমণ আর্জেন্টিনার বক্সে। অবশেষে ৫৯ মিনিটে সেই সাহসেরই পুরস্কার। বক্সের ভিতরে বল পেয়ে ডেরোয় ডুয়ার্তে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের পায়ের ফাঁক গলে দুরন্ত শট নেন। গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে বল জালে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে সেই গোল যেন গোটা ফুটবল বিশ্বের উদ্দেশে এক ঘোষণা, কেপ ভার্দে শুধু অংশগ্রহণ করতে আসেনি, লড়তে এসেছে।

এরপর আবার মঞ্চে ভোজিনহা। দ্বিতীয়ার্ধে তিনি যেন নিজের সেরা রূপে ধরা দেন। মেসির একটি দুর্দান্ত ফ্রিকিক উড়ে গিয়ে অবিশ্বাস্য দক্ষতায় বাঁচান ! তারপর মেসি বনাম ভোজিনহা ! একেবারে মুখোমুখি অবস্থায় মেসির শট শরীর দিয়ে আটকে দেন কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক। একের পর এক সেভ, আর্জেন্টিনা কি তখন হতাশ ? জুলিয়ান আলভারেজ ও নিকো গঞ্জালেজ নামা পরেও পরিস্থিতি বদলায়নি। কখনও রবার্তো লোপেজের দুর্দান্ত ক্লিয়ারেন্স, কখনও ভোজিনহার অনবদ্য সেভ, আবার একটি হ্যান্ডবলের আবেদনও নাকচ হয়। সব মিলিয়ে নির্ধারিত সময় শেষ ১-১ এ !

অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই আবার এগিয়ে আর্জেন্টিনা। কর্নার থেকে ভেসে আসা বলে শক্তিশালী শটে গোল করেন লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। ম্যাচে একটি অ্যাসিস্টের পর নিজের নামও তুলে ফেলেন গোলদাতার তালিকায়। মনে হচ্ছিল এবার কি কেপ ভার্দের লড়াই শেষ ?

কিন্তু এই দলটির অভিধানে আত্মসমর্পণ কথাটা বোধহয়, নেই ! অতিরিক্ত সময়ের ১০৩ মিনিটে ডানদিক থেকে বল, সিডনি লোপেজ কাব্রালের দুর্দান্ত কার্লিং শট ! এমিলিয়ানো মার্টিনেজ তো দূরের কথা, বিশ্বের সেরা গোলকিপারও হয়তো থামাতে পারতেন না। বল জালে জড়াতেই তিনি দৌড়ে উঠে যান গ্যালারিতে, খুঁজে নেন নিজের প্রিয় মানুষকে। সেই মুহূর্তটা যেন ফুটবলের আবেগে আরও এক নতুন সংজ্ঞা ! অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধ শেষ ২-২ সমতায়।

তবে শেষ হাসিটা কেপ ভার্দের হয়নি। ১১১ মিনিটে মেসির কর্নার থেকে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো হেড করতে উঠলে বল লেগে যায় ডিফেন্ডার ডিনের গায়ে। আত্মঘাতী গোল ! ভাগ্যদেবী বিমুখ। ৩-২ গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা এবং সেই ব্যবধানেই জয়। তবে ম্যাচের একেবারে শেষ দিকে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ কয়েকটি অসাধারণ সেভ না করলে ম্যাচের ফল অন্যরকমও হতে পারত। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ এদিন বারবার নড়বড়ে দেখিয়েছে, ভবিষ্যতের কঠিন ম্যাচগুলিতে তা তাদের ভোগাতে পারে।

শেষ পর্যন্ত জয় পেল আর্জেন্টিনা, কিন্তু এই ম্যাচ শুধু তাদের জয়ের গল্প হয়ে থাকল। কারণ কেপ ভার্দের অবিশ্বাস্য সাহস, বিশ্বাস এবং আত্মসম্মানের লড়াইর জন্য। অনেকেই বলেন, পরাজিতদের কেউ মনে রাখে না। কিন্তু সব পরাজয় এক নয়। শেষ পর্যন্ত মাথা উঁচু করে লড়া, নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করে বিশ্বের সেরাদের চোখে চোখ রেখে দাঁড়ানো ! তাই কেপ ভার্দে ইতিহাসে !

লিখতে লিখতে ভাবছিলাম, পশ্চিমবঙ্গের থেকেও লোকসংখ্যা কম ! অথচ তারাও বিশ্বকাপে ! আর ১৪০ কোটির দেশ ভারতবর্ষ ! আর একটা কথা আইএসএলে ফুটবলের নামি দামী দেশ থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচা করে ফুটবলার না এনে, ভারতের টিমগুলি কেপ ভার্দে, আলজেরিয়া, কলম্বিয়ার মত বিশ্বকাপ খেলা পুঁচকে পুঁচকে দেশ থেকে প্লেয়ার আনলে কেমন হয় ? কম টাকায় হত। আপনাদের কি মত?

 

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *