বারাসাতের নীরব স্বাস্থ্য-চ্যালেঞ্জ: আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই  ডাঃ অভ্রদীপ দাস, কনসালটেন্ট- পালমোনোলজি, নারায়ণা হাসপাতাল, বারাসাত…।

বারাসাতের নীরব স্বাস্থ্য-চ্যালেঞ্জ: আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই ডাঃ অভ্রদীপ দাস, কনসালটেন্ট- পালমোনোলজি, নারায়ণা হাসপাতাল, বারাসাত…।

Spread the love

নিজস্ব প্রতিনিধি : বারাসাত, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ডাঃ অভ্রদীপ দাস, কনসালটেন্ট- পালমোনোলজি, নারায়ণা হাসপাতাল, বারাসাত কি বার্তা দিলেন জেনে নিন। বায়ুদূষণ আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা উপলব্ধি করতে খুব বেশি ভাবনাচিন্তার প্রয়োজন হয় না। সমস্যাটির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয় এই তথ্য থেকে যে, PM2.5 (অতি সূক্ষ্ম কণাদূষণ)-এর মাত্রায় স্বল্পমেয়াদি বৃদ্ধি কলকাতায় প্রতি বছর মোট মৃত্যুর ৭.৩ শতাংশের সঙ্গে সম্পর্কিত, যার অর্থ বছরে গড়ে প্রায় ৪,৭০০টি মৃত্যু। আমস্টারডাম-ভিত্তিক বহুল স্বীকৃত ওপেন-অ্যাক্সেস জার্নাল The Lancet Planetary Health-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে।

মহানগর কলকাতা থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার উত্তরে বারাসাতও একই বাতাসে শ্বাস নেয়। অথচ এর স্বাস্থ্যগত মূল্য কতটা, তা এখনও সেভাবে পরিমাপ করা হয়নি। বারাসাতে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে কোনও জাতীয় ডেটাবেসের প্রয়োজন হয় না বুঝতে যে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। যে শিশুর কাশি শীতকাল শেষ হওয়ার পরও সারতে চায় না, কিংবা যে বয়স্ক রোগীর শ্বাসকষ্ট এখন আর শুধু পরিশ্রমের পর দেখা দেয় না—এগুলি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলি এমন একটি প্রবণতার অংশ, যা একজন চিকিৎসক ক্লিনিকের ভিতর থেকে দেখতে পান, কিন্তু যার তথ্য এখনও যথেষ্ট পরিমাণে নথিভুক্ত হয়নি।

বাতাসে থাকা পার্টিকুলেট ম্যাটার আসলে শরীরে কী করে?

চাঁপাডালি মোড় এবং বিভিন্ন জাতীয় ও রাজ্য সড়কের সংযোগস্থলের কাছে যানজটের কারণে PM2.5 ও PM10-এর মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। যাতায়াতের সময় রাস্তার ধুলো, রাস্তা নির্মাণের কাজ এবং খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো থেকেও বাতাসে সূক্ষ্ম ধূলিকণার পরিমাণ বাড়ে। এই কণাগুলি আমাদের শ্বাসযন্ত্র এবং হৃদ্‌যন্ত্র ও রক্তনালীর উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

জ্বালা ও অস্বস্তি: তুলনামূলক বড় কণা PM10 ওপরের শ্বাসনালিতে জ্বালা সৃষ্টি করে ও গলায় খুসখুসে ভাব তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে, সূক্ষ্ম কণাগুলি ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করে অ্যালভিওলাই বা ক্ষুদ্র বায়ুথলির ক্ষতি করতে পারে। ফুসফুসের এই বায়ুথলিগুলিতেই শরীরের অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের আদান-প্রদান হয়। এর ফলে সামগ্রিকভাবে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে।

দীর্ঘস্থায়ী রোগ: দীর্ঘদিন পার্টিকুলেট ম্যাটারের সংস্পর্শে থাকার ফলে অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস এবং ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ (COPD)-এর মতো রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। COPD হল এমন একগুচ্ছ ফুসফুসের রোগ, যা শ্বাসনালিতে বায়ুপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এবং শ্বাস নিতে অসুবিধা করে।

ফুসফুসের ক্যানসার: দীর্ঘমেয়াদি বায়ুদূষণের সংস্পর্শে থাকা এবং দূষিত কণার সঙ্গে যুক্ত কিছু রাসায়নিকের প্রভাবে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

অ্যারিথমিয়া ও হৃদ্‌যন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপে ব্যাঘাত: দূষিত বাতাসে থাকা ক্ষতিকর পদার্থ শরীরের অটোনমিক নার্ভাস সিস্টেমের স্বাভাবিক কার্যকলাপে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। এর ফলে হৃদ্‌যন্ত্রের ছন্দে অস্বাভাবিকতা বা গুরুতর রিদমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বায়ুদূষণে কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে এবং কেন?

বায়ুদূষণের প্রভাব কারও উপরই পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। তবে সমাজের কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠী এর নীরব প্রভাব বেশি অনুভব করতে পারে।

শিশু ও নবজাতক: তাদের ফুসফুস এখনও পুরোপুরি বিকশিত হয়নি এবং প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় তারা দ্রুত হারে শ্বাস নেয়। ফলে তাদের শরীরে তুলনামূলক বেশি পরিমাণ পার্টিকুলেট ম্যাটার প্রবেশ করতে পারে। এর কারণে শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ এবং অ্যাজমার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বয়স্করা: PM2.5 ও PM10-এর সংস্পর্শের কারণে বয়স্ক ব্যক্তিদের স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক এবং COPD-এর মতো সমস্যার ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

বাইরে কাজ করেন যাঁরা: ট্রাফিক পুলিশ, হকার, রিকশাচালক এবং নির্মাণকর্মীরা যানবাহনের ধোঁয়া, রাস্তার ধুলো এবং ব্যস্ত মোড়ের দূষণের সরাসরি সংস্পর্শে থাকেন।

যাঁদের আগে থেকেই শারীরিক সমস্যা রয়েছে: হৃদ্‌যন্ত্রের রোগ, দীর্ঘস্থায়ী ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা বা এমফিসেমায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে AQI বেশি থাকলে, বিশেষ করে শীতকালে, রোগের উপসর্গ বেড়ে যেতে পারে।

আপনি কী করতে পারেন?

আপনি যদি বারাসাতে বসবাস করেন, তাহলে বায়ুর গুণমান সম্পর্কে অতিরিক্ত সতর্ক থাকা জরুরি। দূষিত বাতাসের প্রভাব কমাতে কয়েকটি বিষয় মেনে চলতে পারেন:

প্রতিদিন AQI (Air Quality Index) বা বায়ুর গুণমানের সূচক দেখে নিন। AQI খুব বেশি হলে বাইরে বেরোনো এড়িয়ে চলুন। বাইরে বেরোতেই হলে, বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যায়, যানজটপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘক্ষণ থাকা যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলুন। যানজটের মধ্যে চলাচল করতে হলে সাধারণ মাস্কের পরিবর্তে N95 মাস্ক ব্যবহার করুন।

বাড়ির বাইরে যানবাহনের চাপ বেশি থাকলে জানালা বন্ধ রাখুন। ধূপকাঠি ও মশার কয়েল ব্যবহার এড়িয়ে চলুন এবং প্রয়োজনে এয়ার পিউরিফায়ার ব্যবহার করতে পারেন। পর্যাপ্ত জল পান করুন এবং বাইরে থেকে বাড়ি ফেরার পর নাক ও চোখ জল দিয়ে ধুয়ে নিন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যদি আপনার শ্বাসকষ্টের সমস্যা থাকে, তাহলে সবসময় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারিত ওষুধ সঙ্গে রাখুন।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *