বিজয়া দশমী…। 

বিজয়া দশমী…। 

Spread the love

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ২২ অক্টোবর, ২০২৬। দেবীর চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়, নয় বিচ্ছেদ। দুর্গা প্রতিমা থেকে দেবীর বিদায় আমাদের কাছে কেবল বাহ্যিক রূপের অবসান—আত্মিক উপস্থিতির নয়। আমরা জানি, দেবীকে কখনোই মাটির মূর্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না।

প্রতিমা পূজা ও তার দার্শনিক ব্যাখ্যা

আমরা মূর্তিকে পুজো করি না—আমরা করি তত্ত্বের পূজা। দেবদেবীর আরাধনার মাধ্যমে আমরা ঈশ্বরের বিভিন্ন রূপ ও গুণের উপাসনা করি। প্রতিমা পূজার মূল রহস্য এইখানে—প্রাণ প্রতিষ্ঠা। মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে মাটির নির্জীব প্রতিমাতে চেতনা জাগ্রত করে দেবীকে আহ্বান করা হয়। তখন তিনি প্রতিমায় অবস্থান করেন। কিন্তু পূজা শেষে তাঁকে বিদায় জানানো হয়, প্রতিমা হয়ে যান পুনরায় নিষ্প্রাণ।

 

এই বিসর্জনের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় একটি চিরন্তন সত্য—মূর্তি ঈশ্বর নন, বরং ঈশ্বর আমাদের অন্তরে ও সর্বত্র বিদ্যমান। সুতরাং বিসর্জনের পর ভক্তের হৃদয়-মন্দিরেই দেবী আসন গ্রহণ করেন।

 

গীতার বাণীও আমাদের শেখায়—

“অব্যক্তাদীনি ভুতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত।

অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা॥”

অর্থাৎ, জীবের উৎপত্তি ও লয় অব্যক্তে, মাঝের সময় কেবল প্রকাশ। প্রতিমা বিসর্জন তাই জন্ম-মৃত্যুর এই অনন্ত চক্রের প্রতীক।

 

বিদায়ের আবেগ ও সামাজিক রূপ

 

বাংলার হিন্দুদের কাছে দুর্গা হলেন কন্যাসমা। তাই দশমীর দিনে প্রতিমা বিসর্জন যেন কন্যার বিদায়। ক’দিনের আনন্দ শেষে এ এক গভীর বেদনার মুহূর্ত। তবে ভক্তরা জানে—মা কখনোই সন্তানকে ছেড়ে যান না। তাঁর স্নেহচ্ছায়া সবসময় হৃদয়ে বিরাজ করে।

 

এই বিশ্বাস থেকেই বিজয়ার দিনে বাঙালি সমাজে আছে অনন্য রীতি—

 

একে অপরকে আলিঙ্গন করা,

প্রণাম করা,

মিষ্টি মুখ করানো,

শুভেচ্ছা বিনিময়।

 

অতীতে এই শুভেচ্ছা পত্র আকারে, বাড়ি-বাড়ি গিয়ে ‘বিজয়ার চিঠি’ দিয়ে, মিষ্টি খাইয়ে সম্পন্ন হতো। এখন ডিজিটাল যুগে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপেই সেই প্রথা অব্যাহত রয়েছে।

 

দশমীর ঐতিহাসিক তাৎপর্য

 

এই দিনে দু’টি প্রধান ঐতিহাসিক-পুরাণোৎসব যুক্ত—

 

১. দেবীর অসুর বধ

দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে ইন্দ্রকে স্বর্গরাজ্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন এবং ত্রিভুবনে শান্তি এনেছিলেন। সেই বিজয়ের আনন্দ থেকেই দেবীর নাম হয় বিজয়া।

 

২. রামচন্দ্রের রাবণবধ

শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ রাবণ অন্যায়ের আশ্রয় নিয়ে সীতাকে অপহরণ করেছিলেন। তার ফলস্বরূপ রামচন্দ্রের হাতে তিনি নিহত হন। এই দশানন রাবণ বধ থেকেই এসেছে দশেরা নাম।

 

উত্তর ও মধ্য ভারতে এখনো এই দিনে রাবণ দহন উৎসব পালিত হয়। এর অন্তর্নিহিত অর্থ—আমাদের অন্তরের দশটি অশুভ প্রবৃত্তির বিনাশ।

 

দশটি শত্রু জয়

 

দশমী মানে দশ-শত্রুর উপর জয়। এই দশটি হলো—

১. অহংকার (Ego)

২. অমানবিকতা (Cruelty)

৩. অন্যায় (Injustice)

৪. কামবাসনা (Lust)

৫. ক্রোধ (Anger)

৬. লোভ (Greed)

৭. দাম্ভিকতা (Over Pride)

৮. ঈর্ষা (Jealousy)

৯. মোহ (Attachment)

১০. স্বার্থপরতা (Selfishness)

 

দেবীর দশভুজা রূপও এই তত্ত্ব প্রকাশ করে। প্রতিটি হাতে তিনি যে অস্ত্র ধারণ করেছেন, তা আসলে এই দশ দোষ দমন করার প্রতীক।

 

নারীশক্তির জাগরণ

 

দুর্গাপূজা কেবল অসুর বধের কাহিনী নয়, এটি নারীশক্তির জাগরণেরও প্রতীক। দেবতা ও পৌরুষ শক্তি ব্যর্থ হলে আদ্যাশক্তি মহামায়া নিজেই আবির্ভূত হয়ে অসুর দমন করেন। তাই বিজয়া দশমী হলো নারীশক্তির বিজয়ের উৎসব।

 

অস্ত্রপূজা ও মহাভারতের প্রসঙ্গ

 

নবমী দিনে হয় আয়ুধ পূজা, অস্ত্রশস্ত্রের আরাধনা। দশমীতে প্রার্থনা করা হয় সঠিক প্রয়োগের জন্য। মহাভারতে আছে—১২ বছর অজ্ঞাতবাস শেষে পান্ডবরা দশমীর দিন শমী বৃক্ষের গর্ত থেকে লুকানো অস্ত্র উদ্ধার করে পুনরায় পরিচয় দেন। এই কাহিনী থেকেই দশমীর সঙ্গে শমী বৃক্ষের সম্পর্ক। মহীশূরের রাজা আজও দশেরা উৎসব উপলক্ষে শোভাযাত্রায় শমী বৃক্ষ পূজা করেন।

 

পরিবেশ ও বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য

 

প্রতিমা মাটির তৈরি, প্রাকৃতিক রঙে রঞ্জিত। বিসর্জনের পর আবার তা পঞ্চভূতে মিলিয়ে যায়। এটি প্রকৃতির সঙ্গে চক্রাকার সম্পর্কের প্রতীক এবং আধুনিক ভাষায় ইকো-ফ্রেন্ডলি আচার।

 

মনস্তত্ত্ব ও শূন্যতার দর্শন

 

দুর্গোৎসব শেষে হঠাৎ শূন্যতা নেমে আসে। মানুষ হঠাৎ আনন্দের বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারে না। বিজয়া দশমীর মূল শিক্ষা এখানেই—মা চলে গেলেও তিনি অন্তরে বিরাজমান। তাই বিষাদের মাঝেই ভক্তি, শান্তি ও আনন্দের সুর বেজে ওঠে।

 

আন্তর্জাতিক প্রতিচ্ছবি

 

আজ দুর্গাপূজা কেবল আঞ্চলিক উৎসব নয়, আন্তর্জাতিক উৎসব। কলকাতার দুর্গাপূজা UNESCO-র Intangible Cultural Heritage of Humanity-র স্বীকৃতি পেয়েছে। ফলে বিজয়া দশমী আজ বিশ্বমঞ্চে হিন্দু ধর্ম ও সংস্কৃতির গৌরবময় প্রতীক।

 

-সারমর্ম

বিজয়া দশমী আমাদের শেখায়—

মূর্তি নয়, তত্ত্বই পূজ্য।

বিদায় নয়, হৃদয়ে স্থাপন।

অসুর নয়, অসুরত্বের দমন।

নারীশক্তি ও অন্তর্দোষ জয়।

সমাজে ঐক্য, সম্প্রীতি ও শুভকামনা।

এই দিন তাই কেবল উৎসবের সমাপ্তি নয়—বরং নতুন জীবনের সূচনা।

 

সবাইকে জানাই আমার শুভ বিজয়ার আন্তরিক প্রণাম / প্রীতি / অভিনন্দন। মা দুর্গার স্নেহচ্ছায়া যেন সর্বদা আমাদের অন্তরে বিরাজ করে, তিনি তো যুগে যুগে অশুভের বিনাশ করেন ৷

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *