অর্থ না ইতিহাস সংরক্ষণের মাপকাঠি কি হওয়া উচিৎ …!

অর্থ না ইতিহাস সংরক্ষণের মাপকাঠি কি হওয়া উচিৎ …!

Spread the love

কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ৯ আগস্ট, ২০২৬। সংরক্ষণ ব্যবস্থায় আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষদের জন্য আলাদা ‘সাব কোটা’ বা উপ-সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন একাধিক আবেদনকারী। তাঁদের বক্তব্য, তফসিলি জাতি (এসসি), তফসিলি উপজাতি (এসটি), অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (ওবিসি) এবং অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল শ্রেণির (ইডব্লিউএস) জন্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার একটি নির্দিষ্ট অংশ শুধুমাত্র আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষদের জন্য বরাদ্দ করা হোক। একই সঙ্গে ওবিসি সংরক্ষণের ‘ক্রিমি লেয়ার’ নীতির মত এসসি ও এসটি সংরক্ষণেও সেই ব্যবস্থা কার্যকর করার আবেদনও জানানো হয়।

এই আবেদন ঘিরেই নতুন বিতর্ক। সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া ওই জনস্বার্থ মামলার সরাসরি বিরোধিতা করেছে কেন্দ্রের মোদি সরকার। কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রক আদালতে জমা দেওয়া কাউন্টার এফিডেভিটে স্পষ্ট জানিয়েছে, সংরক্ষণের মূল দর্শন শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দুর্বলতার উপর নির্ভর করে তৈরি হয়নি। বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সামাজিক বৈষম্য, বঞ্চনা, অস্পৃশ্যতা, সামাজিক অবহেলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার মানুষদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা এবং শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে তাঁদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই সংরক্ষণের মূল উদ্দেশ্য। তাই শুধুমাত্র কারও আয় কম বলেই সংরক্ষণের মধ্যে আলাদা অংশ তৈরি করার যুক্তি সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে কেন্দ্রের দাবি।

কেন্দ্র আরও জানায়, সংবিধানে সংরক্ষণের কাঠামো অনুযায়ী শুধুমাত্র আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে এসসি, এসটি বা ওবিসি সংরক্ষণের ভিতরে নতুন করে কোনও সাব-কোটা তৈরির কথা বলা হয়নি। আবেদনকারীরা সংরক্ষণের সাংবিধানিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে ভুল ধারণা থেকেই এই জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন বলেও কেন্দ্রের বক্তব্য। সরকারের মতে, সামাজিক বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতা এক জিনিস নয়। অনেক সময় একজন ব্যক্তি আর্থিকভাবে সচ্ছল হলেও সামাজিক বৈষম্যের শিকার হতে পারেন, আবার কেউ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও সেই ঐতিহাসিক সামাজিক বঞ্চনার অংশ নাও হতে পারেন। ফলে শুধুমাত্র আয়ের ভিত্তিতে সংরক্ষণের কাঠামো বদলে দেওয়া সংবিধানের মূল ভাবনার পরিপন্থী।

আবেদনকারীরা আরও দাবি করেছিলেন, ওবিসি সংরক্ষণের ‘ক্রিমি লেয়ার’ নীতির মত নীতি এসসি এবং এসটি সংরক্ষণেও চালু করা হোক। বর্তমানে ওবিসি শ্রেণির মধ্যে আর্থিকভাবে সচ্ছল, উচ্চশিক্ষিত এবং নির্দিষ্ট আয়ের সীমার উপরে থাকা মানুষরা ‘ক্রিমি লেয়ার’-এর আওতায় পড়েন এবং সংরক্ষণের সুবিধা পান না। আবেদনকারীদের মতে, একই নীতি এসসি ও এসটির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

তবে এই দাবিও খারিজ কেন্দ্রর। সরকারের বক্তব্য, ১৯৯২ সালের ঐতিহাসিক ইন্দ্রা সাহানি মামলায় সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক বেঞ্চ স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল, ‘ক্রিমি লেয়ার’ নীতি শুধুমাত্র ওবিসি সংরক্ষণের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। এসসি ও এসটি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এই নীতির কোনও প্রাসঙ্গিকতা নেই। পরবর্তী একাধিক মামলার রায়েও সেই অবস্থানই বহাল রাখা হয়। তাই আদালতের পূর্ববর্তী সাংবিধানিক ব্যাখ্যা অনুসারেই এসসি ও এসটি সংরক্ষণে ক্রিমি লেয়ার চালুর প্রশ্ন ওঠে না বলে কেন্দ্রের দাবি।

কেন্দ্র আদালতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি তুলে ধরেছে। তাদের বক্তব্য, সংরক্ষণ সংক্রান্ত নীতিতে যদি ভবিষ্যতে কোনও মৌলিক পরিবর্তন আনতেই হয়, তাহলে তা আদালতের নির্দেশে সম্ভব নয়। কারণ, সংবিধানের বিধান পরিবর্তন করার ক্ষমতা শুধুমাত্র সংসদের হাতে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই এমন কোনও পরিবর্তন আনা যেতে পারে। ফলে সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে সরাসরি নির্দেশ দিতে পারে না বলেও কেন্দ্রর স্পষ্ট বার্তা।

এই মামলাকে ঘিরে ফের সামনে সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক। একদিকে আর্থিকভাবে দুর্বল মানুষের জন্য সংরক্ষণের ভিতরে আলাদা অংশ বরাদ্দ করার দাবি, অন্যদিকে কেন্দ্রের যুক্তি সংরক্ষণের ভিত্তি কখনওই শুধুমাত্র অর্থনৈতিক দুর্বলতা নয়; বরং ইতিহাসের দীর্ঘ সামাজিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের ক্ষত মুছে সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। এই বিতর্কের শেষ কথা বলবে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সংবিধানের ব্যাখ্যা, পূর্ববর্তী রায় এবং সরকারের অবস্থান সবকিছু বিচার করেই সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে গোটা দেশ। তবে সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত জানালেও সংবিধান পরিবর্তন হবে কি ?

 

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *