ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় ৷
অন্ধকারের বুকে কৃষ্ণের আবির্ভাব
ভাদ্রের কৃষ্ণপক্ষ, নিশীথের রাত,
মথুরার কারাগারে নেমেছে অন্ধকার।
কংসের অত্যাচারে কাঁদে ধরণী,
দেবকীর চোখে অশ্রু,
বাসুদেবের বুকে অসহায় হাহাকার।
হঠাৎ সেই অন্ধকারের অন্তরেই
জেগে উঠল অনন্ত আলো—
আবির্ভূত হলেন শ্রীকৃষ্ণ,
পরম পুরুষ, পরম ব্রহ্ম,
জগতের পালনকর্তা,
ভক্তের হৃদয়ের ভালো।
জন্ম তাঁর সাধারণ জন্ম নয়,
তিনি অজ, অবিনশ্বর, অনন্ত;
তবু মায়ের কোলে শিশু হয়ে
এসে দিলেন আপন হওয়ার মন্ত্র।
শাস্ত্রের বাণী তাই বলে—
যখন ধর্ম হয় ক্ষীণ,
অধর্ম যখন মাথা তোলে,
সাধুর রক্ষায়, দুষ্টের বিনাশে,
ধর্ম প্রতিষ্ঠার তরে
ভগবান যুগে যুগে আসেন ফিরে।
কারাগারের দ্বার খুলে গেল,
ছিন্ন হলো লোহার শিকল;
বসুদেব মাথায় তুলে নিলেন
ছোট্ট কৃষ্ণকে—
আর যমুনা হল শান্ত,
শেষনাগ মেলল ফণা
সেই দিব্য শিশুর উপর।
মথুরার রাজপ্রাসাদ নয়,
কৃষ্ণ গেলেন গোকুলে—
নন্দের ঘরে, যশোদার কোলে।
পরমেশ্বর হলেন কানাই,
জগতের ঈশ্বর হলেন গোপাল,
মাখনচোর হয়ে চুরি করলেন
ভক্তের হৃদয়খানি।
বৃন্দাবনে উঠল বাঁশির সুর,
যমুনার জলে জাগল প্রেম;
রাধার ভালোবাসায়,
গোপীদের আত্মসমর্পণে
কৃষ্ণ শেখালেন—
প্রেম যেখানে নিঃস্বার্থ,
সেখানেই ঈশ্বরের আবাস।
সেই কৃষ্ণই একদিন
কুরুক্ষেত্রের রথের সারথি হয়ে
অর্জুনকে শোনালেন অমর বাণী—
কর্ম করো, কর্তব্য পালন করো,
ফলের অহংকারে নিজেকে বেঁধো না;
সত্য ও ধর্মের পথে
আমার শরণ নাও।
তাই জন্মাষ্টমী শুধু
একটি জন্মদিন নয়—
এ এক অন্তর্জাগরণের উৎসব।
আজও কংস আছে—
লোভে, হিংসায়, অহংকারে,
মিথ্যায়, অন্যায়ের ক্ষমতায়।
আজও কারাগার আছে—
ভয়, আসক্তি আর অজ্ঞানের শিকলে।
তাই আজ কৃষ্ণ জন্মাক
আমাদের অন্তরের কারাগারে;
ভেঙে দিক অহংকারের শিকল,
জ্বেলে দিক সত্যের আলো,
প্রেমে ভরিয়ে দিক হৃদয়,
ধর্মে আলোকিত করুক জীবন।
কোথাও মথুরায় জন্মের আনন্দ,
কোথাও বৃন্দাবনে বাঁশির সুর,
কোথাও দই-হাঁড়ির উল্লাস,
কোথাও ঘরের দুয়ারে
আঁকা হয় শিশুকৃষ্ণের পদচিহ্ন;
কোথাও কীর্তন, কোথাও নৃত্য,
কোথাও পঞ্চামৃতের স্নান—
রীতি বদলায়, ভাষা বদলায়,
কৃষ্ণভক্তির সুর বদলায় না।
কারণ কৃষ্ণ শুধু মথুরার নন,
শুধু বৃন্দাবনের নন—
তিনি ভক্তের,
তিনি প্রেমের,
তিনি ধর্মের,
তিনি সমগ্র মানবতার অন্তরাত্মা।
যে হৃদয়ে সত্য জাগে,
সেখানে কৃষ্ণের আবির্ভাব;
যে হৃদয়ে প্রেম জাগে,
সেখানেই বৃন্দাবন।
তাই হে নন্দলাল,
আজ জন্মাষ্টমীর পবিত্র রাতে
এসো আমাদের অন্তরে—
অন্ধকার দূর করো,
অহংকার হরণ করো,
কর্মে দাও ধর্মের শক্তি,
চেতনায় দাও জ্ঞানের আলো।
তোমার জন্ম নয়—
তোমার আবির্ভাব হোক
প্রতিটি সত্যনিষ্ঠ হৃদয়ে।
আর পৃথিবী আবার শুনুক
সেই অনন্ত বাঁশির সুর—
জয় শ্রীকৃষ্ণ।
শুভ জন্মাষ্টমী।

