বাংলাদেশের ১১টা জেলায় বন্যা…।

বাংলাদেশের ১১টা জেলায় বন্যা…।

Spread the love

নিজস্ব প্রতিনিধি : ঢাকা, ১৪ জুলাই, ২০২৬।জুলাই মাসের শুরু থেকেই আকাশ ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা বাংলাদেশে ! একটানা ভারী বৃষ্টিতে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন জলমগ্ন। কোথাও নদীর বাঁধ উপচে জল ঢুকছে গ্রামে, কোথাও শহরের রাস্তাঘাটে কোমরসমান জল। মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি থমকে। ঘরবাড়ি, ফসল, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সবকিছুর ওপরেই প্রকৃতির রুদ্ররূপের ছাপ ! দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ এই বন্যার কবলে পড়েছেন। প্রাণ হারিয়েছেন ৫০ এর বেশী। সবথেকে মুস্কিল জল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে সাপের উপদ্রবও। এখনও পর্যন্ত খবর, ৯৫ জনকে সাপে কেটেছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে বন্যাকবলিত ১১টি জেলায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল বাংলাদেশ সরকারের।

বাংলাদেশ আবহাওয়া দপ্তরের তথ্য বলছে, সাধারণত জুলাই মাসে দেশে গড়ে ৫২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু চলতি বছরের জুলাই মাসের প্রথম ১১ দিনেই রেকর্ড ৩৯২ মিলিমিটার বৃষ্টি ! পুরো মাসের স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের প্রায় ৭৫ শতাংশ ! অর্থাৎ মাসের এক-তৃতীয়াংশও শেষ হওয়ার আগেই প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বৃষ্টিপাত ! তার ঠিক উল্টো ছবি দেখা গিয়েছিল জুন মাসে ! তখন স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয় ! সেই ঘাটতি পূরণ করে দিল প্রকৃতি !

সোমবার সকাল থেকেও রাজধানী ঢাকা-সহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় টানা বৃষ্টি। গত রবিবার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত মাত্র ২৭ ঘণ্টায় ঢাকায় ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ! ফলে রাজধানীর বহু রাস্তা জলমগ্ন। যান চলাচল ব্যাহত, ফলে কাজে বার হওয়া সাধারণ মানুষের চরম দুর্ভোগ। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টাতেও ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, রাজশাহী এবং রংপুর বিভাগে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির হওয়ার সম্ভাবনা। এছাড়া বৃহস্পতিবার থেকে মৌসুমি বায়ু আরও সক্রিয় হতে পারে। সেক্ষেত্রে বৃষ্টির পরিমাণ আরও বাড়বে বলেই আশঙ্কা।

একটানা বৃষ্টির ফলে দেশের প্রধান নদীগুলির জলও দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে তিনটি বড় নদীর চারটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে জল বিপদসীমার ওপরে। একইসঙ্গে আরও পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নদীর জল বিপদসীমার একেবারে কাছাকাছি। শ্রীহট্টের সুরমা নদীর সুনামগঞ্জের ছাতক পয়েন্টে জল বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। কুশিয়ারা নদীর সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে জল বিপদসীমার ২৭ সেন্টিমিটার এবং সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে ৭ সেন্টিমিটার ওপরে। অন্যদিকে সোমেশ্বরী নদীর নেত্রকোণার কলমাকান্দা পয়েন্টেও জল বিপদসীমার ওপর। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের ১২৭টি নদী পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের মধ্যে ৮০টিতেই নদীর জলস্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে আগামী কয়েকদিনে বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা।

নদীর জল বৃদ্ধি এবং টানা বর্ষণের ফলে অন্তত ছয়টি জেলার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল এখনই প্লাবিত। বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। জলবন্দি অবস্থায় অসংখ্য পরিবার। বন্যার জেরে বসতবাটি ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত জীবিকা, শিক্ষা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রাও। বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন জানান, বন্যাকবলিত ১১টি জেলায় স্বাস্থ্য পরিষেবা ঠিক রাখার জন্য চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ছুটি বাতিল। হাসপাতালগুলিকেও সর্বক্ষণ প্রস্তুত থাকার জরুরী নির্দেশ। তিনি জানান, এখনও পর্যন্ত ৯৫ জন সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসা করা হয়েছে। সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণ অ্যান্টিভেনম পাঠানোরও ব্যবস্থা। তবে এখনও পর্যন্ত বন্যাকবলিত এলাকায় কলেরা রোগীর কোনও খবর পাওয়া যায়নি। তবুও স্বাস্থ্য দপ্তরে সতর্কবার্তা, বিশুদ্ধ পানীয় জল, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং জরুরি চিকিৎসা পরিষেবা মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার জন্য।

প্রকৃতির নির্মম পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে আজ কঠিন সময় পার করছে বাংলাদেশ। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আপাতত বৃষ্টির রেশ কাটার কোনও সম্ভাবনা নেই। বরং মৌসুমি বায়ু আরও শক্তিশালী হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও তাই সজাগ।

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *