ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায়: কলকাতা।
শ্রাবণ আজও নামে— জানালার কাচে বৃষ্টির অক্ষর, আকাশের গায়ে মেঘের দীর্ঘশ্বাস, আর নীরবে পেরিয়ে যায় একটি তারিখ— ২২ শ্রাবণ।
কোনও শোকসভা নেই, নেই ধূপের ধোঁয়া, নেই কেবল পুরোনো ছবির সামনে নতমুখে দাঁড়িয়ে থাকা— তবু বাংলার প্রতিটি উচ্চারণে আজও কোথাও একটি কণ্ঠস্বর জেগে ওঠে।
যে কণ্ঠ বলেছিল— আকাশ শুধু আকাশ নয়, পথ শুধু পথ নয়, মানুষের ভিতরেও একটি অনন্ত জানালা থাকে।
সেই জানালায় আজও হাওয়া ঢোকে, আজও শিউলি ঝরে, আজও নদীর জলে অচেনা কোনও নৌকা দূরের দিকে ভেসে যায়।
রবীন্দ্রনাথ নেই— এই কথাটিই বরং সবচেয়ে বড় অসম্পূর্ণ বাক্য।
তিনি নেই শান্তিনিকেতনের কোনও ছায়াতলে, নেই জোড়াসাঁকোর ঘরের আলোয়, নেই কোনও বিকেলের খোলা বারান্দায় বসে—
কিন্তু তিনি আছেন বাংলা ভাষার নিঃশ্বাসে, কিশোরের প্রথম কবিতায়, প্রেমিকের অনুচ্চারিত কথায়, মায়ের গুনগুন করা গানে, একলা পথিকের মনে হঠাৎ জ্বলে ওঠা আলোয়।
তিনি আছেন স্বদেশের স্বপ্নে, মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের প্রাচীন কথোপকথনে।
তাই বাইশে শ্রাবণ শুধু চলে যাওয়ার দিন নয়— এ এক ফিরে আসার দিন।
পাতা উল্টোলেই ফিরে আসে শব্দ, গান ধরলেই ফিরে আসে সুর, অন্ধকার নামলেই কোথা থেকে যেন জ্বলে ওঠে একটি প্রদীপ।
সময় অনেক দূর এগিয়েছে, শহর বদলেছে, মানুষের হাতে এসেছে অসংখ্য আলোর পর্দা— তবু কিছু আলো স্ক্রিনে ধরা পড়ে না।
সেই আলো একদিন লিখেছিল— মানুষকে ভালোবাসতে, প্রকৃতিকে চিনতে, অন্ধকারের ভিতরেও আলোর দিকে তাকাতে।
তাই আজও ২২ শ্রাবণের বৃষ্টিতে বাংলা থমকে দাঁড়ায় না, বরং আরও গভীরভাবে নিজেকে পড়ে।
একটি নাম সময়ের সীমানা পেরিয়ে নদীর মতো বয়ে যায়—
রবীন্দ্রনাথ।
আর শ্রাবণের ভেজা বাতাস নিঃশব্দে বলে যায়—
মৃত্যু কেবল একটি মানুষের শরীরের অবসান; যে মানুষ একটি ভাষার ভিতর আলো রেখে যায়, তার কোনও ২২ শ্রাবণ নেই।

