” রথযাত্রা ”
ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা।
রথ এগিয়ে যায়।
কাঠের চাকা ঘোরে— কিন্তু আসলে ঘোরে মানুষের বহুদিন বন্ধ হয়ে থাকা অন্তরের দরজা।
আষাঢ়ের মেঘের নিচে হাজার হাত একই দড়ি ধরে— সেখানে কারও পরিচয় নেই, কেউ রাজা নয়, কেউ ভিখারি নয়, কেউ বড় নয়, কেউ ছোট নয়। শুধু মানুষ। আর সেই মানুষের মাঝখানে নিঃশব্দে হেঁটে চলেন জগন্নাথ।
ঈশ্বরের সবচেয়ে বড় অলৌকিকতা হয়তো এটাই— তিনি উচ্চ আসন ছেড়ে ধুলোমাখা পথ বেছে নেন, যাতে আমরা বুঝতে পারি, করুণা কখনও উঁচু থেকে নেমে আসে না, সে পাশাপাশি হাঁটে।
রথের দড়ি টানতে টানতে হঠাৎ মনে হয়, আমি কি সত্যিই রথ টানছি? নাকি তিনিই আমার ভেতরের ক্লান্ত, অহংকারী, ভীত মানুষটিকে আলোর দিকে টেনে নিয়ে চলেছেন?
ধর্ম শুধু মন্দিরের প্রদীপে নয়, ধর্ম জ্বলে এক ফোঁটা ক্ষমায়, এক মুঠো অন্ন ভাগ করে নেওয়ায়, অচেনা মানুষের চোখের জল নিজের বলে মুছে দেওয়ায়।
প্রতিটি রথযাত্রা তাই একটি প্রশ্ন রেখে যায়— তুমি কি শুধু রথ দেখলে, নাকি নিজের হৃদয়ের পথটিও দেখলে?
যে হৃদয়ে অহংকারের দরজা বন্ধ, সেখানে ঈশ্বর অতিথি হয়ে আসেন না; তিনি সেখানেই বাস করেন।
রথ এগিয়ে যায়… পথ শেষ হয়, উৎসব শেষ হয়, ঢাকের শব্দ স্তব্ধ হয়ে যায়।
শুধু একটি যাত্রা শেষ হয় না কখনও—
মানুষ থেকে আরও মানুষ হয়ে ওঠার যাত্রা।
হয়তো সেই পথের শেষেই জগন্নাথ নন, অপেক্ষা করে আছেন তোমার নিজের নির্মল, জাগ্রত আত্মা।

