নিজস্ব প্রতিনিধি : কলকাতা, ২৬ জুলাই, ২০২৬। ১৬ বছর আগে যে মানুষটিকে ঘিরে ভারতীয় ক্রিকেটে তুমুল বিতর্কের ঝড় উঠেছিল, সেই ললিত মোদিকে ঘিরেই ফের নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকার পর এবার তিনি ভারতে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আইপিএলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত ললিত মোদি জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতেই তিনি দেশে ফিরতে পারেন। এই ঘোষণার নেপথ্যে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াইয়ে তাঁর স্বস্তি পাওয়া। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-র অভিযোগ এবং তদন্তের পর যে মামলা এতদিন ধরে চলছিল, সেই মামলায় ট্রাইব্যুনাল ইডির একাধিক অভিযোগ ও শাস্তির সুপারিশ খারিজ করে দিয়েছে। আর সেই রায়ের পরই দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত ২০০৯ সালের আইপিএলকে কেন্দ্র করে। সেই বছর সাধারণ নির্বাচনের কারণে ভারত থেকে সরিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় আয়োজন করা হয়েছিল আইপিএল। সেই আয়োজন ঘিরেই আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছিল, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড এবং তৎকালীন আইপিএল কমিশনার ললিত মোদি বিদেশে টুর্নামেন্ট আয়োজনের সময় বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা আইন বা ফেমা (FEMA) লঙ্ঘন করেছেন। ইডির দাবি ছিল, আইপিএল আয়োজনের জন্য বিদেশি সংস্থাগুলিকে বোর্ডের তরফ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠানো হয়েছিল এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই অন্তত ২৪৩ কোটি টাকা বিদেশে পাঠানো হয়। এই অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু করে ইডি।
পরে ২০১৮ সালে ইডি জানায়, এই ঘটনায় তৎকালীন বিসিসিআই সভাপতি এন. শ্রীনিবাস, ললিত মোদি-সহ একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। সেই অনুযায়ী বিভিন্ন অভিযোগ তুলে শাস্তির সুপারিশও করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ট্রাইব্যুনাল ইডির সেই দাবির বড় অংশই খারিজ করে দিয়েছে। শুধু অভিযোগ নয়, কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার সুপারিশ করা একাধিক শাস্তিও বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। এই রায়ের পরই কার্যত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন ললিত মোদি।
রায় প্রকাশ্যে আসার পর নিজের প্রতিক্রিয়ায় ললিত মোদি বলেন, গত ১৬ বছর ধরে তিনি নিজের অবস্থান থেকে এক চুলও সরেননি। তাঁর দাবি, তিনি সবসময় ভারতীয় ক্রিকেট এবং আইপিএলের স্বার্থে কাজ করেছেন, কখনও কোনও অন্যায় করেননি। তাঁর কথায়, “১৬ বছর ধরে আমি একটাই অবস্থানে অনড় ছিলাম। ভারতীয় ক্রিকেট এবং আইপিএলের স্বার্থে কাজ করেছি, কোনও অন্যায় করিনি। আসলে সময় হল সবচেয়ে ভালো বিচারক। ১৬ বছর পর অবশেষে বিচার সম্পন্ন হল।” দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে এই রায়কে তিনি নিজের সত্যের জয় বলেই মনে করছেন।
আদালতে স্বস্তি পাওয়ার পর এবার দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। ললিত মোদির বক্তব্য, সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি বছরের শেষ দিকে অথবা আগামী বছরের প্রথম দিকে তিনি ভারতে ফিরবেন। তবে তার আগে পরিবারের একটি বিশেষ মুহূর্তের অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি। অক্টোবর মাসে তাঁর নাতির জন্ম হওয়ার কথা। সেই আনন্দের মুহূর্তের পরই দেশে ফেরার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, “মনে হয় চলতি বছরের শেষ দিকে বা আগামী বছরের প্রথমে আমি ভারতে ফিরব। আসলে অক্টোবর মাসে আমার নাতি হতে চলেছে। তারপর সব ঠিক থাকলেই আমি দেশে ফিরব।”
ক্রিকেটমহলের একাংশ আজও ললিত মোদিকে আইপিএলের জনক বলেই মনে করেন। তাঁর উদ্যোগ, পরিকল্পনা এবং দূরদর্শিতার ফলেই বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ও ধনী ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট লিগের জন্ম হয়েছিল বলে অনেকের মত। যদিও সেই সাফল্যের পাশাপাশি তাঁকে ঘিরে বিতর্কও কম হয়নি। তবে ট্রাইব্যুনালের সাম্প্রতিক রায়ের পর ললিত মোদির দাবি, আইপিএলকে সফল করা ছাড়া তাঁর আর কোনও ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি বলেন, আইপিএলের লাভ এবং ভারতীয় ক্রিকেটের উন্নতির কথাই সবসময় ভেবেছেন। এখন সেই অধ্যায়ের ইতি টেনে নতুনভাবে জীবন শুরু করতে চান তিনি।
১৬ বছর পর আইনি লড়াইয়ের একটি বড় অধ্যায় শেষ হওয়ার মুখে। দীর্ঘ নির্বাসনের পর ললিত মোদির দেশে ফেরার সম্ভাবনা তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তনের খবর নয়, ভারতীয় ক্রিকেটের বহু আলোচিত এক অধ্যায়েরও নতুন মোড়। এখন দেখার, বছরের শেষে কিংবা আগামী বছরের শুরুতে সত্যিই তিনি দেশে ফেরেন কি না এবং সেই প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে নতুন করে কীভাবে শুরু হয় আলোচনার আরেকটি ইনিংস।

