কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : তারাপীঠ, ৩ জুলাই, ২০২৬। দীর্ঘ প্রায় পনেরো বছর পর বদলেছে তারাপীঠ মন্দিরের পরিচালন কমিটি। আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গেই বদলাতে চলেছে বহুদিনের বেশ কিছু নিয়ম ও ব্যবস্থাপনা। মূল লক্ষ্য একটাই, মার ভক্তদের দর্শনের সব সুবিধা করে দেওয়া, দর্শন আরও সুষ্ঠু, নিরাপদ এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ করে তোলা, সেই দিকেই বিশেষ গুরুত্ব নতুন কমিটির। শুধু তাই নয়, মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে দর্শন পদ্ধতি, সব ক্ষেত্রেই একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
বিগত কয়েক বছর ধরেই তারাপীঠ মন্দির এবং তার আশপাশের এলাকা নিয়ে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছিল। মন্দির পরিচালনা, দর্শনার্থীদের ভিড় নিয়ন্ত্রণ, বিশেষ লাইনের ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে একাধিক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রশাসনের কাছেও সেই অভিযোগ পৌঁছয়। বিধানসভা নির্বাচনের পর মন্দির পরিচালনার দায়িত্ব আসে নতুন কমিটির হাতে। জানা গিয়েছে, নির্বাচনের আগে পর্যন্ত প্রায় দেড় দশক ধরে একই কমিটির একাধিপত্য ছিল মন্দির পরিচালনায়। এবার সেই অধ্যায়ের অবসান, দায়িত্বে নতুন সদস্যরা, তাঁরা অধিকাংশই তারাপীঠ মন্দিরের সেবায়েত।
নতুন কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সম্পাদক হয়েছেন পুলক চট্টোপাধ্যায়। বুধবার প্রথম বৈঠকেই তাঁরা একাধিক বড় সিদ্ধান্তে সিলমোহর দেন। সেই সিদ্ধান্তগুলির মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ, আগামী দিনে আর কোনও ভক্তই সরাসরি মার বিগ্রহ স্পর্শ করতে পারবেন না। ভিআইপি হোন বা সাধারণ পুণ্যার্থী, এই নিয়ম সকলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কমিটির মতে, এতে শৃঙ্খলাও বজায় থাকবে, পাশাপাশি বিগ্রহের সুরক্ষাও নিশ্চিত করা সম্ভব।
শুধু এই সিদ্ধান্তই নয়, দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা ভেবেই বিশেষ লাইনের ক্ষেত্রেও নতুন নিয়ম আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতদিন বিশেষ লাইনে প্রবেশের নির্দিষ্ট কোনও সীমা ছিল না। এবার সেই সংখ্যাও বেঁধে দেওয়া হবে। ফলে অতিরিক্ত ভিড় এড়ানো এবং দর্শনের সময়ও অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত রাখা সম্ভব। পাশাপাশি, বিশেষ লাইনের পুণ্যার্থীদের প্রবেশ ও বেরোনোর জন্য আলাদা একটি নির্দিষ্ট গেট তৈরির পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এতে সাধারণ লাইনের সঙ্গে অযথা ভিড় বা বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে না বলেই মনে করছে কমিটি।
ভিড় নিয়ন্ত্রণে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মন্দির কমিটির সভাপতি নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, সাধারণ লাইনের পুণ্যার্থীদের দর্শনের সময়সীমা প্রায় আধ ঘণ্টা এবং বিশেষ বা ভিআইপি লাইনের সময়সীমা হবে কুড়ি মিনিট। তবে গর্ভগৃহে কোনও ভিআইপিকেও অতিরিক্ত সময় দেওয়া হবেনা ! এতে দর্শনের গতি বাড়বে, ফলে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে হবেনা ভক্তদের।
সবচেয়ে আলোচনায় থাকা সিদ্ধান্তটি অবশ্য গর্ভগৃহ নিয়ে। নতুন কমিটির পরিকল্পনা অনুযায়ী, তারাপীঠ মন্দিরের গর্ভগৃহ প্রায় এক ফুট নীচু করা হতে পারে। তবে মা তারার বিগ্রহের উচ্চতায় কোনও পরিবর্তন আনা হবে না। বিগ্রহ থাকবে বর্তমান উচ্চতাতেই। গর্ভগৃহের মেঝে নীচু হয়ে গেলে বাইরে দাঁড়িয়েই সাধারণ ভক্তরা আরও স্পষ্টভাবে মা তারার মুখ দর্শন করতে পারবেন। ফলে গর্ভগৃহে প্রবেশের প্রয়োজন কমবে, একইসঙ্গে বিগ্রহ স্পর্শ করার প্রবণতাও বন্ধ হবে। কমিটির মতে, এই নিয়মে ভক্তদের দর্শনের অভিজ্ঞতা আরও সুন্দর হবে এবং একই সঙ্গে ধর্মীয় মর্যাদাও অক্ষুণ্ণ থাকবে।
এই বৃহৎ সংস্কারকাজের জন্যও প্রাথমিক পরিকল্পনাও তৈরি। জানা গিয়েছে, কৌশিকী অমাবস্যার পর মা তারার বিগ্রহকে যথাযথ ধর্মীয় আচার মেনে সাময়িকভাবে অন্যত্র স্থানান্তর করা হবে। তারপরই শুরু হবে গর্ভগৃহ সংস্কারের কাজ। সমস্ত কাজ শেষ হওয়ার পর পুনরায় নিয়ম মেনে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
নতুন কমিটির এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন মন্দির কমিটির প্রাক্তন সভাপতি তারাময় মুখোপাধ্যায়ও। তিনি জানিয়েছেন, নতুন কমিটির কাজের স্বার্থে তাঁর পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করা হবে। ফলে দীর্ঘদিনের বিতর্ক, অভিযোগ এবং বিশৃঙ্খলার আবহ কাটিয়ে তারাপীঠ মন্দিরে আরও সুশৃঙ্খল, স্বচ্ছ এবং ভক্তবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নতুন কমিটির। তাই আশা, মা তারার দর্শন আরও সহজ, শান্তিপূর্ণ এবং সকলের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত হবে।
পনের বছর পর মৌরসিপাট্টা ভাঙ্গা হয়েছে। আসলে প্রথমে সবকিছুই খুব সুন্দর ভাবে শুরু হয়, বলা ভাল নিয়মমতে। দিন গড়ায়, আস্তে আস্তে নিয়মভঙ্গ ! প্রথমে ভিআইপির জন্য, তারপর আইপির জন্য শেষে আমার লোক তোমার লোক পিদের জন্য !

