স্বামীজির তিরোধান…।

স্বামীজির তিরোধান…।

Spread the love

দীপক রায় : কলকাতা, ৪ জুলাই, ২০২৬। ১৯০২ সাল, ৪ঠা জুলাই। আর চার পাঁচটা দিন সাধারণ মানুষের কাছে। কিন্তু একজন খুব ভোর ভোর উঠে পড়েছেন। নিজের জন্মদাত্রীকে খুব মনে পড়ছে আজ তাঁর। মনটা বিষন্ন হয়ে গেল। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সব মাথা থেকে সরিয়ে দিলেন। কে সব মাথা থেকে সরিয়ে দিলেন? উত্তর হল স্বামীজি।

বয়স বেশি হয়নি, কিন্তু বিভিন্ন রোগ জ্বালা, ডাক্তারের বিধিনিষেধ তাঁকে দুর্বল করে দিয়েছে। তবে আজ বড় চাঙ্গা লাগছে!

সকাল সকাল উপাসনা গৃহে গিয়ে সকলের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করলেন। ফল আর দুধ খেলেন। গুনগুন করে গান গাইছেন। আজ একদম অন্য রূপ। সঙ্গী প্রেমানন্দকে বলে ঠাকুরের শয়নঘরে ধ্যানের জোগাড় করালেন। ধ্যান করলেন।

ধ্যান ভঙ্গ হল, আবার শ্যামাসঙ্গীত গাইতে গাইতে বেরিয়ে এলেন। সবাই স্বামীজির এরকম হাবভাব দেখে অবাক। বহুদিন এরকমভাবে কেউ তাঁকে দেখেননি।

বেলা সাড়ে এগারো, সকলের সাথে খেতে বসলেন। সকালে কোথা থেকে খবর পেয়ে ইলিশ মাছ আনিয়েছেন। এখন মাছ একটু খাওয়া চলবে ডাক্তারের পরামর্শ মতো। কিন্তু স্বামীজি একদম মনের মতো করে খেলেন ইলিশ ভাজা, মাছের টক, অম্বল আরো অনেককিছু। যদিও এতটা বাড়াবাড়ি চলতো কিনা জানা নেই। কিন্তু উনি আজ স্থির করে নিয়েছেন আজ কোনো নিয়মে বাঁধবেন না। আজ যেন শৃঙ্খল ভাঙার সময় এসেছে…

মিনিট কুড়ি আরাম। তারপর আবার শুরু করলেন পড়াশোনা। বিশ্রাম নিলেন না।

এরকম করে দুপুর একটা থেকে চারটে আবার ব্রহ্মচারীদের সাথে ব্যাকরণ চর্চা করতে লাগলেন মজার ছলে। এতটা চাপ নেওয়াটাও কি ঠিক? কিন্তু উনি আজ লাগামছাড়া!

সামান্য দুধ খেয়ে দুমাইল রাস্তা হেঁটে ফেললেন! এমনি দিনে স্বামীজি এতটা হাঁটতে পারছিলেন না। কিন্তু আজ পেরে গেলেন!

বিকেলে মঠের আমগাছের তলায় ছোট বেঞ্চিতে বসে সবার সাথে আড্ডায় বসে গেলেন। একদম প্রাণোচ্ছল আড্ডা! এরকম দেখে মঠের সকলে দারুণ খুশি। সন্ধে হতে সকলের সাথেই চা-ও খেলেন।

সন্ধ্যারতি চলছে। এবার কিন্তু শরীর ঠিক লাগছেনা। ব্রজেন্দ্রকে বলে মালা জোগাড় করে তাকে বাইরে রেখে জপ করতে চলে গেলেন ঘরের ভিতরে।

কিছু পর ব্রজেন্দ্রকে ডেকে নিলেন। ঘরের সব জানালা খুলে দিতে বললেন। গরম লাগছে। আসলে বর্ষার এরকমই আর্দ্রতা ভরা আবহাওয়া তখনও ছিল। মেঝেতে শুয়ে পড়লেন পাতানো বিছানার উপর।

রাত নয়টা দশ…

একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস, মাথাটা স্থির হয়ে গেল।

আসলে সারাদিনের যা কিছু ছিল সবই প্রদীপ নিভে যাবার আগে শেষবারের জন্য জ্বলে ওঠা! চল্লিশ পর্যন্তও থাকলেন না, উনচল্লিশেই দেহত্যাগ করলেন। নিজেও বারবার একথাই বলতেন, সেটাই করলেন।

আজকের দিনটা এলে পিতৃহারার যন্ত্রণাই উপলব্ধি হয়। অভাগার দেশে কত কি দিয়ে গেলেন অথচ মানুষ ওনার কথার ভুল ব্যাখ্যা করে কাটিয়ে দিচ্ছে।

ক্ষমা করবেন মূর্ত মহেশ্বর! আমাদের অপরাধ মার্জনা করবেন। আমরা আপনাকে যথাযথ সম্মান দিতে পারলাম কই …?

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *