আমাদের গুরুদেব বলতেন- কি হবে ক্ষণস্থায়ী ভোগের পিছনে দৌড়ে? অনন্তের অধিকারী হও….।

আমাদের গুরুদেব বলতেন- কি হবে ক্ষণস্থায়ী ভোগের পিছনে দৌড়ে? অনন্তের অধিকারী হও….।

Spread the love

সুদীপা চৌধুরী : মেদিনীপুর, ১০ জুলাই, ২০২৫। আত্মার সঙ্গে পরমাত্মার যিনি মিলন ঘটান, তিনিই গুরু। আমার গুরুদেব –স্বামী স্মরণানন্দজী মহারাজের কিছু কথা..
গুরু পূর্ণিমার প্রাক্কালে গুরুদেব, এবং জগৎগুরু ঠাকুর -মা -স্বামীজির শ্রী চরণে আমার শতকোটি প্রনাম নিবেদন করি।।

আজ গুরু পূর্ণিমা।স্বামী স্মরণানন্দজী মহারাজ , হলেন আমাদের গুরুদেব। আমার স্বামী এবং আমার ছেলে সৌরদীপ ও তার দীক্ষিত শিষ্য। রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক মেদিনীপুরে থাকাকালীন সময়ে গড়ে ওঠে। ঠাকুর,মা স্বামীজির জীবনী এবং কথামৃত পড়ার পর জীবন সম্পর্কে খানিক আধেক ধারণা জন্মায়, যা তীব্র কঠিন মূহুর্তে, দগ্ধ হৃদয়ে , এবং প্রায় নিভে আসা প্রানে এক শীতল বাতাস বইয়ে দিয়ে, এগিয়ে চলো মন্ত্রে আবদ্ধ করে। এ শুধুই অনুভবের। ব্যক্ত করা অসম্ভব।
‘গু’ অর্থে অন্ধকার আর ‘রু’ অর্থে নাশ করা। এই দুই অক্ষরের সমন্বয়ে গুরু শব্দের সৃষ্টি। মনের কালিমা, অজ্ঞানতার অন্ধকার, নিষ্ঠুর, পঙ্কিল হৃদয় এবং অনুর্বর চিন্তা ভাবনায়, যিনি জ্ঞানের আলো জ্বেলে দেন , তিনিই হলেন গুরু।
মা , বাবা, শিক্ষক, শুভাকাঙ্ক্ষী, পথপ্রদর্শক , প্রভৃতি যারাই একজন মানুষের জীবনে , সঠিক জ্ঞান প্রজ্বলিত করে তাকে ঠিক পথের দিশায় নিয়ে যেতে সক্ষম,সেই মানুষটির কাছে তিনিই গুরু হিসেবে বিবেচ্য। এমন নয় যে সন্ন্যাসী বা কোনো আশ্রমের গুরুদেবই শুধু মাত্র গুরু হতে পারেন। মা – বাবা হলেন আমাদের সবার প্রথম গুরু। আর তারপর হলেন শিক্ষক আমাদের জীবনের দ্বিতীয় গুরু।এরপর জীবন পথে চলতে চলতে ভালো খারাপ উভয় পরিস্থিতির মধ্যে আমরা যখন অনবরত হাবুডুবু খেতে থাকি, তখন আঁকড়ে ধরতে চাই এক জনকে, এক অনন্ত আলো কে, এক অপার শক্তিকে, যিনি হাত ধরে সঠিক পথের দিশায় আমাদের নিয়ে পার করিয়ে দেন সংসার সমুদ্র। যিনি নিঃস্বার্থভাবে আমাদের ভালো মন্দের ভার নেন, লাঘব করেন মনের তীব্র দহন।
স্মরণানন্দজী মহারাজ, আমার গুরুদেবের কথা ,এই বিশেষ দিনে একটু লিখি আজ। এছাড়া আর কোনো শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করার সাধ্য যে আমার নেই।
১৯২৯ সালে, তামিলনাড়ুর তাঞ্জাভুর জেলার আন্দামি গ্ৰামে জন্মগ্ৰহন করেন মহারাজ। খুব কম বয়সে মাতৃহারা হন। নাসিক শহরে পড়াশোনা শেষ করে, মুম্বাই এ চাকুরীর উদ্দেশ্যে পাড়ি দেন। আর ঐ সময়ই মুম্বাই রামকৃষ্ণ মিশনে নিয়মিত যাতায়াতের মাধ্যম রামকৃষ্ণ – বিবেকানন্দ ভাবধারার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। নিজেকে প্রশ্ন করেন বারে বারে ‘আমি কে? কি কারণে আমার এই পৃথিবীতে আসা, শুধুই কি দশটা -পাঁচটার চাকরি আর খেয়ে, ঘুরে, ঘুমিয়ে একটি জীবন অতিবাহিত করে দেওয়া। কেবলমাত্র এর জন্যই কি মনুষ্য জন্ম?
শুধুই ভোগ ! শুধুমাত্র নিজের জন্য বাঁচা ? ‘ মন নড়েচড়ে ওঠে। এগিয়ে চলেন কেনো মনুষ্য জন্ম, তার উত্তর খুঁজতে। যোগাযোগ করেন মুম্বাই এর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমে। মাত্র বাইশ বছর বয়সে শংকরানন্দজী মহারাজের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর আর তিনি পিছন ফিরে দেখেননি। রামকৃষ্ণ দেবের মূলমন্ত্রে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণরূপে উৎসর্গ করে দেন। “শিব জ্ঞানে জীব সেবা” মন্ত্র নিজ জীবনে আত্মস্থ করে নেন তিনি। এটাই হয়ে ওঠে জীবনের মূলমন্ত্র , আমৃত্যু। তামিল এবং ইংরেজি ছাড়া ঐ সময়ে অন্য আর কোনো ভাষা তিনি জানতেন না। বেলুড়ে এবং মায়াবতী আশ্রমে থাকাকালীন ভাষা সমস্যায় পড়তে হয়। থেমে যাওয়া যে হেরে যাওয়ার সামিল। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই আয়ত্ত করে নেন সুস্পষ্ট উচ্চারণ সহ বাঙলা ভাষা। পরবর্তী সব বক্তৃতা, মিশনের কাজকর্ম সব বাঙলা ভাষাতেই তিনি করে গেছেন। কতোটা ডেডিকেশন থাকলে এটা সম্ভব,তা বলার বাহুল্য রাখে না। প্রচুর কাজ তিনি করে গেছেন জীবনের শেষ সময় অবধি। তার সম্পর্কে লিখতে গেলে, একটি জীবন কম পড়ে যাবে। কোনো সঠিক কাজই তার কাছে ছোটো ছিল না। একদিকে যেমন গুরু গম্ভীর ব্যক্তিত্ব অপর দিকে শিশু সুলভ আচরণ,কার্য বিশেষে লক্ষ্যনীয়। ছোটো খাটো সব ব্যপারে তার নজর ,তার উদার মনোভাব সমভাবে বন্টিত হতো। আবার রসবোধ, হাসি, মজা করে ও তিনি খেলার ছলে সন্তান সম শিষ্য, সন্ন্যাসীদের ভালো মন্দ দক্ষতার সাথে সামলেছেন। সব দিকে তার কৃপা দৃষ্টি পরিলক্ষিত হয়।
বেলুড় মঠের ষোড়শ সঙ্ঘাধ্যক্ষ ছিলেন তিনি ।প্রেসিডেন্ট মহারাজ পদে আসীন ছিলেন তিনি ২০১৭ সাল
থেকে । ঐ সময়ই ২০১৯ সালে তিনি আসেন মেদিনীপুর রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রমে। বেশ কয়েক বছর ধরেই দীক্ষার ইচ্ছা মনে জাগ্ৰত হয়েছিল, ঘটনাক্রমে এবং অবশ্যই ঠাকুর -মা-স্বামীজীর ইচ্ছায় , আমাদের দীক্ষা সম্পন্ন হয় স্মরণানন্দজী মহারাজের কাছে। হয়ে ওঠেন তিনি আমাদের গুরুদেব।
সৌরদীপ, তখন ক্লাস নাইনে, ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হবে। সে ও কিন্তু নিজ মনের তাগিদেই গুরুদেবের সান্নিধ্যে যায়। হয়তো দীক্ষা বা মন্ত্রের তাৎপর্য তার ঐ বয়সে জানার কথা ও নয় , কিন্তু গুরুদেবের প্রতি একটা টান,একটা ভালো লাগা, শ্রদ্ধা এগুলো নিজে থেকেই তার মধ্যে গড়ে উঠেছিল।
ঐ সময় ঐ দিন গুরুদেবকে একদম কাছে দেখেছিলাম, চরণে স্পর্শ করে প্রনাম করতে গিয়ে অবাক হই , এতো শীতল,নরম পা দুটো। তিনি তখন কিন্তু বেশ অসুস্থ, তবু ও এক মূহুর্তের জন্য ও কাজের মধ্যে তা প্রতিফলিত হয়নি। মাথায় তার আশীর্বাদী হাতের পরশ আজ ও অনুভব করি। আর তাই হয়তো এখনো চলতে পারছি ।
ফের একবার ছুটে গেছিলাম তার কাছে । বড্ড অসহায়, ক্লান্ত, হাহাকার এলোমেলো বেশভূষায় ছুটে ছিলাম তার দ্বারে।গত ২৭শে জুলাই , ২০২৩,বৃহস্পতিবার , মহাশ্মশান থেকে ফিরে দিশেহারা, বেঁচে থাকার নেই কোনো উদ্দেশ্য, বৃথা এ জীবন, কি করবো এ রেখে। পরের দিন ২৮ শে জুলাই, শুক্রবার , গুরুদেব তখন নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে। অসুস্থতা বেশ বেড়েছে, অবশ্যই বয়সজনিত কারণে। কিন্তু তিনি যে ঠাকুরের উত্তরসূরী ,তার বার্তা বহক, শরীর তুচ্ছ এনাদের কাছে, যা আমরা সাধারণ মানুষ উপলব্ধি করতে সক্ষম নই। নয়তো গলায় ক্যান্সার নিয়ে ও কেউ , দিব্যি ভালো আছি, দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করতে পারে !
প্রচুর ভিড় , সবাই দূর দূরান্ত থেকে এসেছেন গুরুদেব কে দর্শন, প্রনাম করতে ‌। কিন্তু আমার ঐ অবস্থা দেখে, সবার আগে ভিতরে, তার কাছে নিয়ে গেলেন, গুরুদেবের দেখা শোনায় ,যারা নিয়োজিত ছিলেন। অনেক অনেক ধন্যবাদ, তাদের। কৃতজ্ঞ থাকবো আমরণ, তাদের কাছে।
আমি সামনে গিয়ে বসে কিছুই বলতে পারছি না শুধুই কাঁদছি, সৌরদীপের পাপা, কান্নার কারণ জানায়। গুরুদেবের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা, মহারাজ তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ঘটনাটা বলেন। বয়সের দরুন এবং নার্ভের সমস্যা দেখা দেওয়ায়, গুরুদেব শুনতে, বলতে পারতেন কম, শেষের দিকে।
সব শুনে তিনি এক অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। আমি একটু বসে, প্রনাম জানিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। ওর পাপা, পাশে মহারাজের সাথে কিছু কথা বললো, এরপর আমরা বেরিয়ে আসছি,কি খেয়াল হতে পিছন ঘুরে তাকালাম, দেখি গুরুদেব তখন ও আমার দিকে কৃপা দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছেন, দরজায় দাঁড়িয়ে আমি ও কিছু ক্ষণের জন্য স্থির হয়ে আসতে আসতে ঐ দিকে তাকিয়েই বেরিয়ে এলাম।
যতক্ষণ দেখা যাচ্ছিল, গুরুদেব কিন্তু তাকিয়েই ছিলেন। আজ ও চোখ বন্ধ করে তা অনুভব করি, স্পষ্ট দেখতে পাই।
২৬ শে মার্চ, ২০২৪ রাত ৮:১৪ মিনিটে,৯৫ বছরের দোরগোড়ায় এসে, তিনি যাত্রা করলেন রামকৃষ্ণ লোকে। স্তব্ধ হলো ঠাকুরের একটি অধ্যায়। ঠাকুরের সন্তানের ঠাকুরের বুকেই হলো নিরঞ্জন। সৌরদীপ ও চলে গেলো আর তারপর গুরুদেব, এদের অভাব তো পূরন হবার নয়। কিন্তু এদের কথা, এদের স্মৃতি, এদের চিন্তা ভাবনাই যে বাকি পথের সম্বল।
গুরুদেব শিখিয়েছেন বৈরাগ্য মানেই যে সন্ন্যাস নয় । সমাজে বসবাসকারী মানুষকে স্বার্থপরতা কমিয়ে ফেলতে হবে আর সেটাই বৈরাগ্য ।
তিনি খুব সহজ ভাষায় বুঝিয়েছেন,
ঈশ্বর মেঘের ওপারে বা আকাশের কোথাও বসে নেই। তিনি রয়েছেন নিজ নিজ হৃদয়ে, সবার মধ্যে,সর্বত্র। নিজেকে জানতে পারলেই , ঈশ্বরকে জানতে পারা যাবে,তথা সর্বশক্তিমানকে উপলব্ধি করা যাবে ।
স্মরণানন্দজী মহারাজের মুখ নিঃসৃত একটি সুন্দর বানী দিয়ে আমার লেখা শেষ করি —
“কি হবে ক্ষণস্থায়ী ভোগের পিছনে দৌড়ে? অনন্তের অধিকারী হও। আর একটা কথা মনে রেখো— মনুষ্যজন্ম আবার হয়তো হবে, মুক্তির বাসনা পরজীবনে আবার হয়তো আসবে, কিন্তু এবারের মতো সাধুসঙ্গ বার বার পাবে না। সব সময় মহাপুরুষের সঙ্গ ভাগ্যে জোটা বড় দুর্লভ। জন্ম-জন্মান্তরের অনেক সুকৃতি ও তপস্যার ফলে এই সুযোগ হয়। ভাগ্যফলে যখন ঠাকুরের গণ্ডির ভিতর এসে পড়েছ, দেখো যেন জীবনটা গোলমালে কেটে না যায়।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *