কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ১২ জুলাই, ২০২৬। মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও বিশ্বকাপের মঞ্চে দেশের জার্সি গায়ে লড়াই করেছেন ! ঠিকঠাক বললে, দিন ষোল ! সতীর্থদের সঙ্গে স্বপ্ন দেখেছিলেন আরও অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার। কিন্তু সেই স্বপ্ন, এখনই থেমে যাবে, তা কেউ কল্পনাও করেনি ! দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবলে তাই গভীর শোকের ছায়া। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই প্রয়াত হলেন দেশের প্রতিভাবান মিডফিল্ডার জেডেন অ্যাডামস ! তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা নয়, গোটা ফুটবল বিশ্ব বিস্ময়ে চুপ ! এখনও পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি। ফলে শোকের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে রহস্যও।
বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে এবারের আসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন অ্যাডামস। গ্রুপ পর্বে মেক্সিকো, চেক রিপাবলিক এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে তিনটি ম্যাচেই তিনি মাঠে। চেক রিপাবলিকের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ম্যাচে প্রথম একাদশে জায়গা পান। দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে বদলি হিসেবে নেমে দলের মাঝমাঠে লড়াইর স্তম্ভ ! তবে রাউন্ড অব ৩২-এ কানাডার বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার ০-১ হারের ম্যাচে তাঁকে মাঠে নামানো হয়নি। তাই শেষ পর্যন্ত দেশের জার্সিতে দক্ষিণ কোরিয়ার ম্যাচটি তাঁর জীবনের শেষ ম্যাচ। বিশ্বকাপে দেশের অভিযান শেষ হওয়ার মাত্র ১৬ দিনের মধ্যেই নিভে গেল এক সম্ভাবনাময় ফুটবল জীবনের আলো !
জেডেন অ্যাডামসের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে দক্ষিণ আফ্রিকা ফুটবল প্লেয়ার্স ইউনিয়ন (সাফপু)। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, “মামেলোদি সানডাউনস এবং বাফানা বাফানার মিডফিল্ডার জেডেন অ্যাডামসের অকাল প্রয়াণে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তিনি এবারের বিশ্বকাপে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁর পরিবার, সতীর্থ, ক্লাব এবং গোটা দেশের ফুটবলের জন্য এ এক অপূরণীয় ক্ষতি।” ফুটবল মহলের অনেকেই মনে করছেন, দক্ষিণ আফ্রিকার ভবিষ্যতের অন্যতম ভরসা ছিলেন অ্যাডামস। তাঁর চলে যাওয়া দেশের ফুটবলে বড় ধাক্কা।
অ্যাডামসের ফুটবল যাত্রার শুরু হয় দক্ষিণ আফ্রিকার ক্লাব স্টেলেনবস এফসির যুব অ্যাকাডেমি থেকে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর প্রতিভা নজর কাড়ে কোচদের। ধীরে ধীরে নিজেকে প্রমাণ করে তিনি হয়ে ওঠেন স্টেলেনবসের ইতিহাসে, ক্লাবের সঙ্গে পেশাদার চুক্তি করা প্রথম অ্যাকাডেমি ফুটবলার । এই অর্জনই তাঁর কেরিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কেপ টাউনে জন্ম নেওয়া এই তরুণ ফুটবলার স্টেলেনবসের জার্সিতে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেন। ক্লাবটির হয়ে মোট ১৩৯টি ম্যাচ খেলেন এবং ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্সের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবলে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেন।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তাঁর কেরিয়ারে বড় পরিবর্তন ! স্টেলেনবস ছেড়ে তিনি যোগ দেন দক্ষিণ আফ্রিকার অন্যতম সফল ক্লাব মামেলোদি সানডাউনসে। আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী এই ক্লাবের হয়ে খেলার সুযোগ তাঁর কেরিয়ারের বড় সাফল্য। সানডাউনসের জার্সিতেও নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেন অ্যাডামস। ধারাবাহিক ভালো খেলার পুরস্কার হিসেবে জায়গা, দক্ষিণ আফ্রিকার বিশ্বকাপ দলে। দেশের হয়ে বিশ্বমঞ্চে খেলার স্বপ্ন পূরণ তাঁর। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথচলা এত তাড়াতাড়ি থেমে যাবে, তা কেউ ভাবেননি।
জেডেন অ্যাডামসের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রীড়ামন্ত্রী গেটন ম্যাকেঞ্জিও। তিনি বলেন, “দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল তার অন্যতম উজ্জ্বল তরুণ প্রতিভাকে হারাল। তাঁর পরিবার, সতীর্থ এবং লক্ষ লক্ষ সমর্থকের সঙ্গে আমরাও শোকাহত। অ্যাকাডেমির এক ফুটবলার থেকে তাঁর আন্তর্জাতিক তারকা হয়ে ওঠার গল্প আগামী প্রজন্মের অনুপ্রেরণা।” তাঁর এই মন্তব্যেই স্পষ্ট, অ্যাডামস শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না, তিনি ছিলেন কঠোর পরিশ্রম, স্বপ্ন আর সাফল্যের প্রতীক।
এদিকে, ওয়েস্টার্ন কেপ পুলিশ জানিয়েছে, শনিবার সকালে কেপ টাউনের স্কটসচেকলোফ এলাকার একটি বাড়ি থেকে ২৫ বছর বয়সি এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে জানা যায়, তিনি জেডেন অ্যাডামস। ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে। পুলিশের মুখপাত্র এফসি ভ্যান উইক জানিয়েছেন, “এই ঘটনার সমস্ত দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।” তাই আপাতত তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে কোনও সরকারি ব্যাখ্যা সামনে আসেনি।
বিশ্বকাপের আলো থেকে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে মৃত্যু, চিরতরে হারিয়ে গেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার এই প্রতিভাবান মিডফিল্ডার। কিন্তু তাঁর লড়াই, তাঁর উত্থান, তাঁর সাফল্য এবং দেশের জার্সির প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ভালবাসা ফুটবলপ্রেমীদের মনে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকবে। জেডেন অ্যাডামস মাঠে ফিরবেন না, কিন্তু তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন আর অনুপ্রেরণার গল্প দক্ষিণ আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।
আমাদের তরফ থেকেও জানাই, শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা। এত লড়াই ঝগড়া মান অভিমান অহংকার গর্ব সব শেষ ! আজ ভোররাতেই ছাড়লাম, এই ভাবনার ওপরে একটা রিলস ! ‘গগনে গরজে মেঘ….’ হেডলাইন। তারপরেই এই খবর ! আসলে বেঁচে থাকাই পৃথিবীর সবথেকে বড় আশ্চর্য, বড় সত্যি।

