ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ১ মে ২০২৬।
” বাণিজ্যে বসতঃ মা গন্ধেশ্বরী ” ৷বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন
সারা বাংলা জুড়ে ধূমধামের সঙ্গে অনুষ্টিত হয় মা দুর্গার আরেক রূপ ” গন্ধেশ্বরীর পুজো ” ৷ ইনি চতুর্ভূজা দুর্গা ৷ উভয়েই সিংহ বাহিনী ও অসুরমর্দিনী ৷ইনি ত্রিশূল দিয়ে গন্ধাসুরকে বধ করেছিলেন ৷যিনি চন্ডীতে বলেছেন ,”একৈ বাহং জগত অত্র দ্বিতীয়া কা মমাপরা “( জগতে আমি ছাড়া আর কে আছে ? বিশ্ব সংসারের সবকিছু আমার বিভূতি ) ৷সব দেবদেবীই তাঁর মধ্যে বিলীন ৷ তাঁরই নানারূপ ৷গন্ধেশ্বরী মায়ের হাতে জগদ্ধাত্রীর মত শঙ্খ , চক্র ,ধনুর্বাণ শোভা পায় ৷ইনি কেয়ূর হার বলয় চন্দ্রহার ধারিণী ও নূপুর পরিহিতা ৷তপ্তকাঞ্চন বা মারকত বর্ণা ৷আসলে তিনি পৃথিবী মাতা ৷ পঞ্চভূত – ক্ষিতি – শব্দ+ স্পর্শ + রূপ + রস+ গন্ধ ৷ অপঃ- শব্দ + স্পর্শ+রূপ+রস ৷ তেজঃ- শব্দ+স্পর্শ+ রূপ ৷ মরুৎ- শব্দ+স্পর্শ ৷ আর ব্যোম হলো শুধু শব্দ ৷ যার সমষ্টি হলো গন্ধ ৷ আর গন্ধের দেবী হলেন গন্ধেশ্বরী ৷তিনি চর্তুভূজা , সিংহবাহিণী , মরকত বর্ণা৷ তিনিই চন্ডী , নারায়ণী , বনদুর্গা ও জয়দুর্গা ৷
যখন ব্রহ্মার শক্তি ব্রহ্মাণী , নারায়ণের শক্তি নারায়ণী আবার শিবের শক্তি তিনিই শিবা ৷ইনি নারসিংহী ,
বরাহী ও কৌমরী ৷ দুর্গা মন্ত্রে পূজিতা ৷ বেদব্যাসের লেখা বলে পরিচিত “মহানন্দীশ্বর পুরাণ” থেকে জানা যায় নারীলোভী অসুর সুভূতি নিজের বউ থাকতেও বেনের মেয়ে সুরূপাকে হরণ করতে গিয়ে বণিকদের হাতে ধরা খেয়ে মারধর ও লাঞ্ছনার শিকার হয় ৷ বাবার অপমানের এর প্রতিশোধ নিতে তার ছেলে গন্ধাসুর যে ছিল শিবের বরে বলীয়ান বেনে বংশ ধ্বংসের প্রতিজ্ঞা করে ৷ সেও ছিল বাপকো বেটা ৷ চরিত্রহীন , লম্পট ৷ বেনেদের মেয়ে বউ অপহরণ করতে থাকে ৷ সুবর্ণবট নামের এক বণিক নেতাকে হত্যা করে তার বউ পূর্ণগর্ভা চন্দ্রাবতীতে মারতে যায় ৷ চন্দ্রাবতী নিজেকে ও পেটের সন্তানকে বাঁচাতে ছুটে বনে পালায় এবং সেখানে কশ্যপ মুনির আশ্রমের কাছে কন্যা সন্তান প্রসব করে মারা যায় ৷ মহামায়ার স্বপ্নাদেশে কশ্যপ ঋষি দিব্য সুগন্ধ লক্ষ্য করে বনে গিয়ে দেখেন একটা ফুটফুটে সদ্যজাত মেয়ে ৷ তাঁর আশ্রমে তিলোত্তমার মত রূপ লাবণ্যের অধিকারী গন্ধবতী বড় হতে থাকে ৷ গন্ধবতী যৌবনে পা দিলে শোনে তার পিতামাতার করুণ কাহিনী এবং গন্ধাসুরের নৃশংসতার কথা ও অত্যাচারিত বণিকদের দূরবস্থা ৷অসুরদের অপমানে গন্ধবতী ধ্যানে বসে ও যজ্ঞের আয়োজন করে ৷ যজ্ঞের ধোঁয়া দেখে হতচকিত গন্ধাসুর ও তার দলবল দেখে যজ্ঞস্থল থেকে উথ্থিত হচ্ছেন চতুর্ভুজা সিংহবাহিনী জ্যোতির্ময়ী দেবী ৷দেবীকে দেখে গন্ধবতীর ধ্যান ভেঙে যায় ৷ দেবীর সাথে অসুরদের যুদ্ধ বেধে যায় এবং ঐ দেবীর ত্রিশূলাঘাতে দুরাচারী গন্ধাসুরের মৃত্যু হয় ৷ এই দেবী মর্ত্যে বণিক সমাজে “গন্ধেশ্বরী ” নামে পুজো পেতে থাকেন ৷সেই দিনটি ছিল বৈশাখী পূর্ণিমার দিন ৷ গন্ধাসুরের দেহ পরিণত হয় বিশালাকার গন্ধদ্বীপে ৷ সে দ্বীপে উদ্ভূত সুগন্ধী মশলা এবং বৃক্ষ-লতা- বীরুৎমালা সমূহকে দেবী ঐ দ্বীপ থেকে আহরণ করে বেনে সম্প্রদায়কে বাণিজ্যের অধিকার দেন ৷ ঐ বণিকদের নাম হয় ” গন্ধবণিক “৷ মনে করা হয় শৈব গন্ধবণিকরা কূলদেবী গন্ধেশ্বরীর পুজোর মধ্য দিয়ে হন শাক্ত ৷ ১৫০০ ফুট উঁচু বাঁকুড়ার শুশুনিয়া পাহাড়ের নিচে গন্ধেশ্বরী নদীর তীরে প্রথম শুরু হয় এই দেবীর আরাধনা ৷ মনে করা হয় গহন বনে ঋষির কুটিরে জন্ম নেন এক সুলক্ষ্মণা কন্যা “গন্ধবতী” ৷ সেখানকার আখ্যানে পড়েছি যা আগের কাহিনীর অনুরূপ ৷মহর্ষি কশ্যপের এই কন্যা জগতকে গন্ধাসুরের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিতে তপস্যায় বসেন ৷ গন্ধবতীর সৌরভে আকাশ বাতাস সুবাসিত হয়ে ওঠে ৷ তপস্যায় তুষ্ট হয়ে গন্ধবতীর কাছে দেবী দেখা দেন ৷ মহাযুদ্ধে গন্ধাসুর পরাস্ত হয় ৷ তার শরীর সাগরের জলে ভাসিয়ে দেওয়া হয় ৷ বলা হয় সেখানে সৃষ্টি হয় গন্ধদ্বীপ ৷ এই গন্ধদ্রবের ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ উর্পাজন করেন বাংলার গন্ধবণিকরা ৷ বাংলার আদিশক্তি গন্ধেশ্বরীর পূজা প্রচলন করেন দেবদাস , শঙ্খভূতি , আবট দত্ত ও বিম্বট গুপ্ত নামের চার জন বাঙালী বণিক ৷ যাঁরা সুগন্ধি
দ্রব্য , ধূপ -ধূনা , মশলা , মুদিখানা বা নটকোনা ( বীরভূমের ভাষায় ) ব্যবসা করেন তাঁদের ” গন্ধবণিক ” বলা হত ৷ চৈনিক পরিব্রাজক ফা হিয়েনের বিবরনে বাংলার এই সমৃদ্ধ জাতির উল্লেখ আছে ৷যাঁরা সুগন্ধি দ্রব্যাদির পসরা সাজিয়ে বড় বড় ময়ূর পঙ্খী নৌকায় দেশবিদেশে পাড়ি দিতেন ৷ঝড় , বৃষ্টি , ডাকাত , বন্য জন্তুর হাত থেকে রেহাই পেতে গন্ধেশ্বরী মাতার পুজো করেন ৷এই পুজো সহ হিন্দুর বিভিন্ন পূজাপার্বণ , ধর্মগ্রন্থ , দেবদেবী , তীর্থাদি সহ নানা বিষয়ে আমার “সনাতনী কৃষ্টিকথা ” বইয়ে লেখা আছে ৷আমার নম্বরে তিনশো টাকা ফোন পে বা গুগুল পে করে হোয়াটস এপে পুরো ঠিকানা দিলে ক্যুরিয়ারে বাড়ীতে বই পৌঁছে যাবে ৷ বইয়ের দোকানেও পেতে পারেন ৷ মঙ্গল কাব্যেতো বাংলার এই বণিকদের বাণিজ্যের গৌরব গাঁথা প্রচুর৷
শ্রীমন্ত সদাগরের শ্রীলঙ্কা যাত্রা ৷চাঁদের সপ্ত ডিঙা ভাসিয়ে দেশে বিদেশে ব্যবসা করতে যাওয়া ৷ ধনপতি সদাগরের কাহিনী ৷ আরো কত কী ! তখন বাঙালীর ছিল গোয়াল ভরা গরু , মাঠ ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ও হাঁস ৷ সেই সোনার বাংলায় তৈরী হত রেশম বস্ত্র ও মসলিন ৷ যা বিদেশে নিয়ে যেত গন্ধ বণিক সাহসী ও পরিশ্রমী ব্যবসায়ীরা ৷ তাঁরা সমাজে এত প্রতিপত্তি শালী ছিলেন যে মনসা ও চন্ডীর মত লৌকিক দেবীরা এই সওদাগরদের পুজো পাওয়ার
অপেক্ষা করতেন ৷ কারন , এঁদের পুজো ছাড়া দেবীর সামাজিক প্রতিষ্ঠা সম্ভব হত না ৷ বাংলার বৌদ্ধদের মধ্যেও গন্ধেশ্বরী পূজিতা হতেন ৷ বাংলাদেশের পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারে গন্ধেশ্বরীর মূর্তি পাওয়া গেছে ৷ চৈনিক পরিব্রাজক ফা হিয়েন গন্ধবণিক সম্প্রদায়কে হিন্দু বণিক বলে উল্লেখ করেন ৷আজও বণিক রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ ( অজন্তা ) , জেডি ফারমা
সিউটিক্যাল ( বোরোলীন ) , দে’জ মেডিক্যাল এঁদের সততা ও পরিশ্রমের সাক্ষর হয়ে আছে ৷ মাড়োয়ারি , গুজরাতি , সিন্ধ্রি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ৷ তবে , বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি একসময় মানুষকে ব্যবসা ও শিল্প বিমুখ করে ৷ আসি যাই মাইনে পাই তো ব্যবসায় হয় না ৷ চাই কঠোর পরিশ্রম ৷ গন্ধবণিক ঘরেও দেখা গেল ব্যবসায়ী পাত্রের বাজার মন্দা ৷ সব মেয়ের বাবা চাকরীজীবি পাত্র খোঁজে ৷ তাই , মেধাবী ছেলেরা পৈতৃক ব্যবসা ও শিল্প ছেড়ে দিতে শুরু করে৷ এ বিষয়ে গন্ধবণিক মহাসভা , কিংবা গন্ধবণিক ছাত্রাবাস যে ভূমিকা রাখতে পারত তা রাখতে পারেনি ৷ এখন স্টার্ট আফ ইন্ডিয়া , মেক ইন ইন্ডিয়া , এগিয়ে বাংলা কি এবিষয়ে আজন্ম ব্যবসায়ী সমাজের ছেলেমেয়েদের এগিয়ে দেবে ?
আজ ১ মে ( ১৮ বৈশাখ ১৪৩৩ ) ২০২৬ শুক্রবার বৈশাখী বা বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন গন্ধবণিকদের দোকানে দোকানে হিসাব খাতা, ওজন যন্ত্র পূজিত হবে সিংহবাহিণী , অসুর নাশিনী মা গন্ধেশ্বরীর প্রতিমা বা পটের সামনে ৷ জয় মা গন্ধেশ্বরী ৷ তাঁকে আমরা প্রণাম জানাই ,”দুর্গা দুর্গতিহারিণী ভবতু নঃ” অর্থাৎ দুর্গাহারিণী দুর্গারূপে ৷পাঠ করি তাঁর বীজমন্ত্র “ওঁ হ্রিং ওঁ”! আমার লেখা “সনাতনী কৃষ্টিকথা ” বইয়ে হিন্দু ধর্মের এমন অনেক আখ্যান তুলে ধরেছি ৷ তাই , গন্ধেশ্বরীর গায়ত্রী মন্ত্র পাঠ করি ,” ওঁ হ্রিং গন্ধেশ্বরী দুর্গায়ৈ বিদ্মহে বাণিজ্যবৃদ্ধিকরণ্যৈ ধীমহি তন্নো দেবী প্রচোদয়াৎ “৷ প্রণাম জানাই ,” শঙ্খ চক্র গদাশার্ঙ্গ গৃহীতপরমায়ুধে ৷ / প্রসীদ বৈষ্ণবীরূপে নারায়ণী নমোহস্তুতে “৷

