নিজস্ব প্রতিবেদকঃ কলকাতা, ১৩ জুলাই, ২০২৬। সোমবার থেকেই পশ্চিমবঙ্গে কার্যকর বহুচর্চিত ‘পশ্চিমবঙ্গ জননিরাপত্তা এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ আইন’, সাধারণ মানুষের কাছে ‘গুন্ডাদমন আইন’ নামেই পরিচিত। আইনটি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপ দমনে প্রশাসনের হাতে আরও বেশি ক্ষমতা তুলে দেওয়া হল। একদিকে সরকারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ, জমি দখল, বেআইনি কারবার এবং সংগঠিত অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতেই এই আইনের প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে বিরোধীদের অভিযোগ, এই আইন ভবিষ্যতে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ফলে আইনটি কার্যকর হওয়ার আগেই রাজনৈতিক বিতর্ক, কার্যকর হওয়ার পরে সেই বিতর্ক আরও জোরালো !
গত ২৯ জুন রাজ্য বিধানসভায় পাশ হয় ‘পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক সেফটি অ্যান্ড কন্ট্রোল অফ অ্যান্টি-সোশাল অ্যাক্টিভিটিজ বিল, ২০২৬’। সেই বিলই এখন আইনে পরিণত হয়েছে। এই আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক, রাজ্য সরকার, কলকাতার পুলিশ কমিশনার, কোনও জেলার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা সরকার মনোনীত ডিআইজি পদমর্যাদার কোনও আধিকারিক কোনও ব্যক্তি সমাজের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন, মনে করলে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাঁকে আটক করার নির্দেশ দিতে পারবেন। প্রয়োজনে সেই ব্যক্তিকে কোনও নিয়মিত বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত আটকেও রাখা যেতে পারে। তবে তাঁর কোনও অধিকার থাকবে না তা নয়। আটক ব্যক্তি চাইলে সরকারের নির্ধারিত কমিটি বা কমিশনের কাছে আবেদন জানিয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে পারবেন।
এই আইনে সমাজবিরোধী কার্যকলাপের সংজ্ঞাও অনেক বিস্তৃত করা হয়েছে। শুধু খুন, ডাকাতি বা রাজনৈতিক হিংসার মতো অপরাধই নয়, এমন কোন কাজ যার ফলে সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে বা মানুষ নিজেদের নিরাপত্তাহীন মনে করতে পারেন, সেগুলিকেও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ হিসেবে ধরা হবে। আইন অনুযায়ী, জনশৃঙ্খলা নষ্ট করা, মানুষের জীবন বা সম্পত্তির ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করা, আইনসম্মত ব্যবসা বা পেশায় বাধা দেওয়া, বেআইনিভাবে কারও জমি বা অন্য সম্পত্তি দখল করা, সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙ্গচুর বা ক্ষতি করা, বেআইনিভাবে বালি, পাথর, খনিজ বা অন্য প্রাকৃতিক সম্পদ তোলা, বনজ সম্পদ বা বন্যপ্রাণীর ক্ষতি করা সবই এখন থেকে এই আইনের আওতায়। অর্থাৎ, আইনটি শুধু রাজনৈতিক হিংসা মোকাবিলার জন্য নয়, বরং তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ, জমি দখল, বেআইনি খনি, বালি পাচার, সম্পত্তি নষ্ট করা কিংবা ব্যবসায় বাধা দেওয়ার মতো সংগঠিত অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যেও তৈরি করা হয়েছে।
আইনে ‘গুন্ডা’ শব্দটিরও একটি নির্দিষ্ট সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি যদি নিজে অথবা কোনও দল, গ্যাং বা সিন্ডিকেটের সদস্য কিংবা নেতা হিসেবে অভ্যাসগতভাবে সমাজবিরোধী কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে তাঁকে ‘গুন্ডা’ হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে। এছাড়াও অস্ত্র আইন, মাদক আইন, অনৈতিক পাচার প্রতিরোধ আইন, বিস্ফোরক আইন কিংবা ভারতীয় ন্যায় সংহিতার নির্দিষ্ট গুরুতর ধারার অপরাধে জড়িত হলে, অথবা এই ধরনের অপরাধ করার চেষ্টা করেন বা পরিকল্পনায় যুক্ত থাকলে, তাঁদেরও এই আইনের আওতায় আনা যাবে। শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়, ভবিষ্যতে অপরাধের সম্ভাবনা থাকলেও প্রশাসন আগাম পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
এই আইনে ক্ষতিপূরণের বিষয়েও বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কোনও সমাজবিরোধী কার্যকলাপে সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষতি হলে, সরকার গঠিত কমিশন সেই ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করে জরিমানা ধার্য করতে পারবে। শুধু তাই নয়, প্রয়োজনে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণের দ্বিগুণ পর্যন্ত দৃষ্টান্তমূলক ক্ষতিপূরণ বা জরিমানাও ধার্য করা সম্ভব। সরকারের মতে, ভবিষ্যতে সমাজবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে এই কড়া বার্তায় অপরাধীরা এমন কাজ করার আগে বহুবার ভাববে।
সরকারের যুক্তি, এতদিনকার আইনগুলি বর্তমান পরিস্থিতিতে সংগঠিত অপরাধ দমনের জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট রাজ, বেআইনি দখলদারি, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন ধরনের অপরাধ এমন জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিল যে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কঠোর আইনের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। সেই কারণেই পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থার হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হল, অপরাধ ঘটার পর নয়, অপরাধের আগেই তা রুখে দেওয়ার জন্য।
তবে এই আইনকে ঘিরে বিরোধীদের আপত্তিও কম নয়। তাঁদের অভিযোগ, বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই কাউকে দীর্ঘ সময় আটক রাখার ক্ষমতা প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী। বিরোধীদের দাবি, এই আইন ভবিষ্যতে রাজনৈতিক বিরোধিতা, প্রতিবাদ বা সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনের হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার হতে পারে। সেই কারণেই তাঁরা এই আইনকে ‘কালা কানুন’ বলে কটাক্ষ করছেন। তাঁদের আশঙ্কা, আইনের বিস্তৃত সংজ্ঞা এবং প্রশাসনের হাতে দেওয়া অতিরিক্ত ক্ষমতার অপব্যবহার হলে সাধারণ মানুষও হয়রানির শিকার হতে পারেন।
ফলে একদিকে সরকার এই আইনকে রাজ্যের শান্তি, নিরাপত্তা এবং সংগঠিত অপরাধ দমনের জন্য একটি প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে দাবি করছে, অন্যদিকে বিরোধীরা একে গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করার আশঙ্কাজনক আইন হিসেবে তুলে ধরছে। বাস্তবে এই আইন কতটা কার্যকর হবে, অপরাধ দমনে কতটা সফল হবে এবং একই সঙ্গে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আইনের শাসনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবে কিনা এখন সেদিকেই নজর সবার।
এই আইন মনে করিয়ে দিল ১৯৭১ সালের মিসা আইনের কথা। তবে তিনটে তফাৎ চোখে পড়ল। প্রথম, মিসা আইনে ১৮ মাস অবধি বিনা বিচারে আটকে রাখা যেত, এই আইনে তা ১২ মাস। দ্বিতীয়, এই আইনে আটক ব্যক্তির কমিটি বা কমিশনের কাছে আবেদন জানাতে পারবে, নিজের বক্তব্য জানানোর জন্য। মিসা আইনে, সম্ভবত এই সুযোগ ছিলনা। ক্ষতিপূরণেরও কি কোন ব্যবস্থা ছিল ?
তবে সমাজ এবং রাজ্যকে সমাজবিরোধী মুক্ত করার জন্য কড়া আইন দরকার। পশ্চিমবঙ্গ এমনিতেই সীমান্তবর্তী রাজ্য, তায় আইন শৃঙ্খলা তলানিতে ! দেশের সুরক্ষার জন্যও, মনে হয় কড়া আইন প্রয়োজন।
তবে বিরোধী পক্ষের বক্তব্যও ফেলে দেওয়ার নয় ! জরুরী অবস্থার সময় সাধারণ মানুষ দেখেছেন মিসা আইনের অপব্যবহার ! গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাও কখনও কাম্য নয়। সরকারের কোন সিদ্ধান্ত রাজ্যের বা সাধারণ মানুষের পক্ষে ক্ষতিকারক মনে হলে, তা নির্দ্বিধায় তুলে ধরা বিরোধী পক্ষের দায়িত্ব। সরকার এবং বিরোধী পক্ষের মধ্যে এই ভারসাম্য এবং বোঝাপড়া জরুরী গণতন্ত্র রাজ্যবাসী এবং রাজ্যের মঙ্গলের জন্য। আশা করব, নতুন সরকার তা স্মরণে রাখবেন। আপনাদের কি ধারণা এই নতুন আইন নিয়ে ::
