কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : নিউ দিল্লি, ৯ জুলাই, ২০২৬। টানা এক রাতের প্রবল বর্ষণে রাজধানী দিল্লির স্বাভাবিক জীবন আপাতত থমকে ! বুধবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টি বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকায় রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত জলমগ্ন ! কোথাও হাঁটুসমান জল, কোথাও রাস্তার ওপর উপড়ে পড়েছে বিশাল গাছ, আবার কোথাও বৃষ্টির দাপটে ভেঙ্গে পড়েছে নির্মীয়মান বাড়ি। বর্ষার এই ভয়ংকর রূপে বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন, প্রাণহানির ঘটনায় আরও উদ্বেগ !
সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা রোহিনী এলাকায়। প্রবল বৃষ্টির জেরে একটি নির্মীয়মান বাড়ি ভেঙে পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে তিন জনের মৃত্যু হয়। উদ্ধারকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করলেও শেষরক্ষা হয়নি। এই দুর্ঘটনা ফের একবার প্রশ্ন, ভারী বর্ষণের সময়ে নির্মীয়মান ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে।
এদিকে মৌসম ভবনের আগাম সতর্কবার্তা, বৃহস্পতিবারও দিল্লিতে বজ্রবিদ্যুৎসহ ভারী বৃষ্টির প্রবল সম্ভাবনা। অর্থাৎ আপাতত স্বস্তির কোনও ইঙ্গিত নেই। বরং পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলেই আশঙ্কা। প্রশাসনের তরফে নিকাশি ব্যবস্থা সচল রাখতে জোর দেওয়া হলেও বাস্তবে তার খুব একটা সুফল মিলছে না। কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই রাজধানীর বহু এলাকার ড্রেন উপচে জল রাস্তায় ! ফলে শহরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা এখন ছোটখাটো নদী।
দুর্যোগের একাধিক ভিডিও ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে। সেই ছবিগুলিতে দেখা যাচ্ছে, বিস্তীর্ণ রাস্তা জলের তলায় ডুবে ! বহু জায়গায় গাড়িগুলি প্রায় হামাগুড়ি অবস্থায়। কোথাও ইঞ্জিনে জল ঢুকে মাঝরাস্তাতেই বিকল। অন্যদিকে, নোংরা হাঁটুজল ভেঙ্গেই গন্তব্যের উদ্দেশ্যে এগোতে বাধ্য হচ্ছেন অফিসযাত্রী, ছাত্রছাত্রী এবং সাধারণ মানুষ। প্রতিটি পদক্ষেপেই দুর্ভোগের ছবি।
শুধু জল জমাই নয়, প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়ায় রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে একাধিক বড় গাছ উপড়ে পড়েছে। তার জেরে বহু গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা অবরুদ্ধ। ফলে শহরের নানা প্রান্তে দীর্ঘ যানজট। অফিস টাইমে সেই যানজট আরও ভয়াবহ। হাজার হাজার মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় আটকে পড়েন। কেউ গাড়ির মধ্যে, কেউ বাসে, আবার কেউ ভিজতেই ভিজতে অপেক্ষা করেছেন রাস্তা স্বাভাবিক হওয়ার।
দিল্লির যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি জল জমেছে, তার মধ্যে সদর বাজার, গ্রেটার কৈলাশ, বদরপুর, নাসিরপুর, তেলিওয়ারা, মহাবীর বাজার, স্বরূপ নগর, কুশক রোড, মুনিরকা, দ্বারকা, বিকাশ মার্গ, পূর্ব দিল্লি এবং নতুন দিল্লি রেলওয়ে স্টেশন চত্বর অন্যতম। এই সমস্ত এলাকায় রাস্তাঘাট কার্যত জলের নীচে ! হাঁটাচলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে, যানবাহন চলাচলও প্রায় বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি। অনেক জায়গায় দোকানপাট ও নিচুতলার বাড়িগুলিতেও জল ঢুকে পড়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
আবহাওয়া দপ্তরের পরিসংখ্যানও এই বৃষ্টির তীব্রতার সাক্ষ্য দিচ্ছে। সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় দিল্লির প্রধান আবহাওয়া কেন্দ্র সফদরজংয়ে ৭২.৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে লোধি রোডে হয়েছে ৮০.২ মিলিমিটার বৃষ্টি, রিজ এলাকায় ৭৭.৮ মিলিমিটার, পালামে ৬৩ মিলিমিটার এবং আয়ানগরে ৫৭.৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এত অল্প সময়ে এত বিপুল পরিমাণ বৃষ্টিই রাজধানীর নিকাশি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাকে আরও একবার সামনে এনে দিয়েছে।
এই দুর্যোগ শুধু দিল্লির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রভাব পড়েছে রাজধানীর লাগোয়া গুরুগ্রামেও। সেখানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। নরসিংহপুর, বসাই, উমাং ভরদ্বাজ চক, কাদিপুর, সেক্টর ১০এ এবং সোহনা রোড সংলগ্ন দিল্লি-জয়পুর জাতীয় সড়কে তীব্র যানজট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেছে অসংখ্য গাড়ি। কর্মব্যস্ত দিনের শুরুতেই যাত্রীদের দুর্ভোগও চরমে।
বর্ষা প্রতি বছরই দিল্লির কাছে এক কঠিন পরীক্ষা। কিন্তু এ বছরের এই প্রবল বর্ষণ আবারও দেখিয়ে দিল, কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টি এখনও দেশের রাজধানীর স্বাভাবিক ছন্দকে সম্পূর্ণ থামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। একদিকে প্রাণহানি, অন্যদিকে জলমগ্ন রাস্তা, ভেঙে পড়া গাছ, অচল যান চলাচল এবং বিপর্যস্ত জনজীবন—সব মিলিয়ে বর্ষার সৌন্দর্য নয়, এবার দিল্লির মানুষ দেখছে তার নির্মম রূপ। এখন সকলের নজর আকাশের দিকে। কারণ আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস সত্যি হলে, আগামী কয়েক ঘণ্টায় রাজধানীর দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।
প্রবল বৃষ্টিতে জল জমা, বাড়ী ভেঙ্গে পড়া তাহলে রাজধানীতেও বিরাট সমস্যা ! আগামী দিনে এই অবস্থার অবসান কি সম্ভব ?

