কাল স্পেন ফাঁদ পেতেছিল ধরা পড়ল আর্জেন্টিনা… !

কাল স্পেন ফাঁদ পেতেছিল ধরা পড়ল আর্জেন্টিনা… !

Spread the love

মেসি কি মারাডোনার ছায়াও !

 

কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার  : কলকাতা, ২০ জুলাই, ২০২৬। আমি ফুটবল বোদ্ধা নই। একটু আধটু দেখি। তাই বোঝার চেষ্টা করি যতকিঞ্চিৎ। খেলা দেখতে আমার মনে হয়েছে এই কথাটা। মেসির মধ্যে কি দিয়াগো মারাডোনার ঝলকও আছে ? মেসি বড় মাপের ফুটবলার, অস্বীকার করিনা, কিন্তু মারাডোনার মানের কি ! ৪১+ বয়সে রোনাল্ডো একা যতটুকু ঝলকানি দেখালো, মেসি কি তাও পেরেছেন ! অতি বড় সাপোর্টারও, প্রকৃত ফুটবলপ্রেমী হলে, আর্জেন্টিনার এই কথা কি অস্বীকার করতে পারবেন আর্জেন্টিনা বা মেসিকে অনেকসময় টেনে খেলানো হয়নি ! নাহলে ভাগ্যের সহায়তা ! কিন্তু, রোজ রোজ কি আর তা পাওয়া যায় ? গতকালও সেই রকম একটা দিন। বারবার কি আর ধান খাওয়া যায় ! ফাঁদে একদিন পড়তেই হয়।

কাল স্পেন সেই ফাঁদটাই পেতেছিল। ধরাও পড়ল তাই আর্জেন্টিনা ! একই সঙ্গে স্পেনেরও ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বকাপ জয়ের পর আবারও বিশ্বের সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন তাদের। আর অন্যদিকে, ইতিহাস গড়ে টানা দু’বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন চুরমার লিওনেল মেসি এবং আর্জেন্টিনার।

রবিবারের ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের বিশ্বকাপ লা রোহার। ম্যাচের একমাত্র গোলটি অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে। বাঁ দিক থেকে নিকো উইলিয়ামসের নিখুঁত ক্রস পেয়ে বাঁ পায়ের জোরালো শট, বল জালে জড়িয়ে দেন ফেরান তোরেস।

এই ফাইনালের আলাদা একটি ঐতিহাসিক গুরুত্বও ছিল। ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল দুই স্প্যানিশভাষী দেশ উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা। তারপর দীর্ঘ ৯৬ বছর কেটে গেছে, পেরিয়েছে ২২টি বিশ্বকাপ। ১৯৩০ এর প্রথম বিশ্বকাপের পর আবার ২০২৬ সালের ২৩তম বিশ্বকাপে ফাইনালের মুখোমুখি দুই স্প্যানিশভাষী দেশ স্পেন ও আর্জেন্টিনা।

একদিকে ইউরোপীয় পাসিং ফুটবলের অন্যতম প্রতিনিধি, অন্যদিকে লাতিন আমেরিকার আবেগ ও লড়াইয়ের প্রতীক। কিন্তু সেই মহারণ শেষ পর্যন্ত একেবারেই একপেশে !

শুরু থেকেই ম্যাচের রাশ স্পেনের হাতে। বলের দখল, পাসিং, গতি, কৌশল প্রতিটি বিভাগেই তারা অনেক এগিয়ে। সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল তাদের হাই প্রেসিং। বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই চারদিক থেকে আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের ঘিরে ধরছিলেন স্প্যানিশরা। ফলে নিজেদের অর্ধ থেকেই স্বাভাবিকভাবেই আক্রমণ ঘেঁটে ঘ আর্জেন্টিনার। মাঝমাঠে জায়গা তৈরি করা তো দূরের কথা, কয়েকটি পাস একসঙ্গে খেলাও তাদের কাছে তখন কঠিন !

পরিস্থিতি সামলাতে প্রথম একাদশে তিনটি পরিবর্তন করেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। ডান প্রান্তে গঞ্জালো মন্তিয়েলকে নামানো হয় উইং ধরে আক্রমণ তৈরির উদ্দেশ্যে। মাঝমাঠে রদ্রিগো দি পল বলের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো, পাশাপাশি মেসির জন্য জায়গা তৈরি। লিয়ান্দ্রো পারেদেসের দায়িত্ব ছিল মাঝমাঠে ভারসাম্য বজায় রাখা। কিন্তু পরিকল্পনা আর মাঠের ফুটবলে আকাশ পাতাল ফারাক !

মন্তিয়েলকে একবারও স্বাভাবিকভাবে প্রান্ত দিয়ে উঠতে দেয়নি স্পেন। দি পল যতবার বল পেয়েছেন, ততবারই স্পেনের চাপের মুখে বল জমা। পারেদেসও ছন্দে ছিলেন না। ফলে মেসির কাছে বল পৌঁছনোই বন্ধ !

আর্জেন্টিনার সবচেয়ে খারাপ ম্যাচ এদিন ! শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মূলত রক্ষণ সামলাতেই ব্যস্ত ! নিজেদের অর্ধেই অধিকাংশ সময় ! ফলে স্পেনের আরও বেশি করে আক্রমণের সুযোগ। এমনকি ১২০ মিনিটের পুরো ম্যাচে স্পেনের গোল লক্ষ্য করে একটি শটও নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা ! এত নেতিবাচক ফুটবল কেন !

এই ম্যাচে সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছেন লিওনেল মেসি। স্পেনের রদ্রি ও আইমেরিক লাপোর্তে তাঁকে কার্যত ঘিরে রেখেছিলেন। মাঝমাঠে বল পেলেই তাঁকে চাপে ফেলা হচ্ছিল। সতীর্থরাও তাঁর কাছে বল পৌঁছে দিতে পারেননি। ফলে গোটা ম্যাচে মেসিকে প্রায় অদৃশ্যই। নিজের ছন্দে খেলতে পারেননি, আক্রমণও তথৈবচ !

তবে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ একা এদিন কুম্ভ ! ৭৫ মিনিটের মধ্যেই সাতটি দুর্দান্ত সেভ ! নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হওয়ার আগেই তাঁর সেভের সংখ্যা ১০-এ। পরাস্ত হলেন অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে। নিকো উইলিয়ামসের নিখুঁত ক্রস থেকে ফেরান তোরেস আর কোনও ভুল করেননি। তাঁর বাঁ পায়ের শটের সামনে অসহায় আর্জেন্টিনার বিশ্বস্ত গোলরক্ষক।

লিসান্দ্রো মার্টিনেজের পরিবর্তে নামেন অভিজ্ঞ নিকোলাস ওটামেন্ডি। কিন্তু বয়সের কারণে আগের মতো গতি নেই। সেই দুর্বলতাকে দারুণভাবে কাজে লাগায় স্পেন।

আর্জেন্টিনার পাল্টা আক্রমণের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে সুযোগই পায়নি। স্পেনের সংগঠিত রক্ষণ, শক্তিশালী মিডফিল্ড এবং নিরন্তর প্রেসিংয়ের সামনে তাদের প্রতি-আক্রমণ অসহায় ! দ্বিতীয়ার্ধে ইয়ামাল, কুকুরেয়া ও ওয়ারজাবালের আক্রমণের ঝড়। শেষে সাফল্য।

শেষ বাঁশি বাজার পর স্প্যানিশ ফুটবলারদের উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠে মাঠ। কেউ জাতীয় পতাকা গায়ে জড়িয়ে দৌড়চ্ছেন, কেউ আবেগে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছেন। আর অন্য প্রান্তে চুপচাপ লিওনেল মেসি। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ হাতে তোলার স্বপ্ন চুরমার। ফুটবলের নির্মম সত্য আবারও সামনে, প্রত্যেক গল্পের শেষটা রূপকথা হয় না। ভাগ্য তো সাহসীদেরই সহায় হয়, তাই তো ?

 

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *