বেহুলা লখিন্দরের বাসর ঘর, মহাস্থানগড় ,বগুড়া ,বাংলাদেশ…।

বেহুলা লখিন্দরের বাসর ঘর, মহাস্থানগড় ,বগুড়া ,বাংলাদেশ…।

Spread the love

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ১১ জুলাই, ২০২৬। পুরাণ কাহিনির মতই আমাকে টানে মঙ্গল কাব্যের কাহিনি ও চরিত্র ৷ এসব লোককাহিনি পুরোদস্তুর ইতিহাস না হলেও দেশ ও সমাজের চিত্র ফুটে ওঠে৷

লোক ধর্মে রয়েছে মানুষের নাড়ির টান ৷ মাঝে মাঝে পড়ি নানা মঙ্গল কাব্য ৷সে ভাবেই পড়েছি বিপ্রদাস পিপলাই ও কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের মনসা মঙ্গল ৷ এসব কাহিনি মানুষের এত কাছের অনেক জায়গাই এসব স্থান নিজের এলাকার বলে দাবী করে ৷ সেবারে বাসে বাংলাদেশের রাজশাহী থেকে রংপুর যাচ্ছিলাম ৷ বাসে সঙ্গী হলো একঝাঁক তরুণী ৷ সাংবাদিক জেনে তারা আলাপ জুড়ে দিল , যেন কতকালের চেনা ৷ ওরা মাস্টার ডিগ্রীর কোর্স শেষ করে চাটিপাটি গুটিয়ে হল থেকে বাড়ী যাচ্ছিল ৷ ওরা ঠিক করলো রংপুর যাওয়ার আগে আমাকে বগুড়ার “মহাস্থান গড় ” দেখাবে ৷ তাদের সঙ্গে নামলাম আড়াই হাজার বছর আগের “পুন্ড্রনগর”

আজকের ” মহাস্থানগড়ে ” ৷ গড় মানে উঁচু জায়গা ৷যা ছিল ধর্মপ্রচারকদের বাসস্থান ৷ হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজাদের সময়ের অনেক প্রত্নসামগ্রী মিলেছে এখানে খননকাজের পর ৷ হিউয়েন সাঙও এখানকার বর্ণনা দিয়েছিলেন ৷ এলাকার মানুষের বিশ্বাস এখানে ছিল বাংলা স্বর্ণযুগের বিখ্যাতআমদানী  রপ্তানীকারী ব্যবসায়ী ” চাঁদ সদাগরের ” বাড়ী ৷ ওরা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখালো ৷ বললো এখানে ছিল ” বেহুলা – লখিন্দরের বাসর ঘর ” ৷ যেখানে কালনাগিনীর কামড় খেয়ে লোহার বাসরঘরের মধ্যে চিৎকার করে লখাই বলে ,- ” জাগো হে বেহুলা সায় – বেনের ঝি ৷ / তোরে পাইল কালনিদ্রা মোরে খাইল কি ?” দেশে বিদেশে সপ্ত ডিঙা ভাসিয়ে সওদায় যেত চাঁদ বেনে ৷ সমাজে তাঁর প্রতিপত্তি ছিল অপরিসীম ৷ অনেক টাকা থাকলেও তিনি ছিলেন জনকের মত রাজর্ষি ৷ শিবের মস্ত ভক্ত ৷ মনসা জানত চাঁদ না পুজো দিলে মর্ত্যে তাঁর পুজোর প্রচার অসম্ভব ৷ মনসা পুজো দিতে বললে চাঁদ না দেওয়ায় মনসা একে একে তাঁর ছয় পুত্র ও বন্ধু শঙ্কর গাড়ুরীকে সর্প দংশনে মেরে ফেলে ৷ শেষে লোহার নিচ্ছিদ্র বাসর ঘর তৈরী করে চাঁদ ছোট ছেলে লখাইয়ের বিয়ে দেন ৷ তাও কালনাগিনীর কামড়ে বাসর রাতেই ছেলের মৃত্যু হয় ৷ মৃত স্বামীকে নিয়ে সশরীরে নেতা ধোপানির সহায়তায় স্বর্গে গিয়ে নাচ , গান করে দেবতাদের তুষ্ট করে বেহুলা স্বামী নিয়ে ফেরে ৷ শেষে চাঁদ বোঝেন এতদিন তিনি শিব পুজো নয় দাম্ভিকতার পুজো করছেন ৷ তখন সবার কথায় বাঁ হাতে মনসাকে পুজো দেন ৷ এই স্তোত্র বলে –

” দেবীমম্বাহীনাং শশধরবদনাং

চারুকান্তিং বদনাং

সর্বদা সর্বদেবং ৷”

মনসা দেবী প্রীত হয়ে করেন তাঁর মৃত সাত পুত্র ও বন্ধুর জীবন দান ৷ মনসা মঙ্গলের এই কাহিনি অনেকেরই জানা ! তবে , কোথায় ” চম্পক নগর” এখন ফয়সালা করা অসম্ভব ৷ হুগলির ত্রিবেণীতে রয়েছে “নেতা ধোপানির ” ঘাট ৷ কেউ জানি না আসলে তা কোথায় ছিল ৷ গিয়েছি পশ্চিম বর্ধমানের পানাগড়ের পাশে কসবায় ৷ যার নাম

চম্পকনগর ! এখানে রয়েছে ৬ ফুট উঁচু আর ৩ ফুট বেড়ের প্রাচীন ” শিবলিঙ্গ ” ৷ সবার বিশ্বাস নিজ নগরে এই শিবলিঙ্গটি “চাঁদ সদাগর ” স্থাপন করে নিত্য পুজো করতেন ৷ বাঙালি গন্ধবণিক সমাজ এখনও এটি জাতিকূলতিলক চাঁদ বণিকের মনে করে রোজ পুজো দেন ৷ আবার পূর্ব বর্ধমানের জৌগ্রামের দত্তদের টেরাকোটার মন্দিরের শিব লিঙ্গটি স্থানীয় বিশ্বাস চাঁদ সদাগরের ইস্ট দেবতা শিবের ৷পুরাণ ও মঙ্গল কাব্যের কাহিনির সাথে ঘুরে আসুন ৷ বাঙালির ধর্ম , কৃষ্টি ও সংস্কৃতি জানতে এর জুড়ি নেই ৷ বিজ্ঞানে সবসময় এর উত্তর মেলে না ৷ এখন আমরা জানি কামড়ালেও কালনাগিণী বিষহীন ৷ তাতে মানুষ বিষে মরবে না ৷ হয়তো , লখাই সাপে কাটায় ভয় পেয়ে কিংবা ছিদ্র হীন লোহার ঘরে দম বন্ধ হয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল ৷ পরে জলের ঝাপটায় নদী ও সাগরের ঠান্ডা হাওয়ায় তার জ্ঞান ফিরে ৷ স্বর্গ বলতে আমরা যা বুঝি জীবিত মানুষ সেখানে যেতে পারে না ৷ কাহিনির মাহাত্ম্যের প্রয়োজনে তখনকার মানুষ স্বর্গের উপমা দিয়েছেন ৷যাহোক মঙ্গল কাব্য বাঙালির মজ্জায় ৷ মনসায় ভক্তি শাশ্বত ৷

 

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *