জগৎগুরু পরমহংস জ্ঞানানন্দ মহারাজ…।

জগৎগুরু পরমহংস জ্ঞানানন্দ মহারাজ…।

Spread the love

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ৯ জুলাই, ২০২৬। ইনি এমন একজন হিন্দু আধ্যাত্মিক নেতা যিনি সনাতন ধর্মের দুটি ধারা শাক্ত ও বৈষ্ণবদের মধ্যে সম্বন্বয় সাধন করেছিলেন ৷ ৫৫ বছর বয়সে “পরমহংস” উপাধি লাভের পর পরিব্রজোকাচার্য , কুলাবধূত জ্ঞানানন্দ মহারাজ “কৃষ্ণ -কালী” মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন ৷ এখনও তাঁর হুগলীর ত্রিবেণীর বাড়ীতে যথাযোগ্য মর্যাদায় কৃষ্ণ-কালীর নিত্য পূজা হয় ৷ দীপাবলীর রাতে ধূমধাম সহকারে হয় বাৎসরিক পুজো ৷ যিনি ছিলেন সর্ববিধ কুসংস্কারের বিরোধী ৷আর গৃহী শিষ্য -ভক্তদের সাধারণ অনুশীলনের মাধ্যমে “সহজ সাধন ” রীতির প্রর্বতক ৷ তিনি বলেছেন ঈশ্বর এক ৷ কিন্তু , তাঁকে পাওয়ার বা উপলব্ধি করার পথ অনেক ৷ যার যেভাবে ভগবানকে পাওয়ার বাসনা সেভাবেই তা পূরণ হতে পারে ৷ দরকার সৃষ্টিকর্তা তথা সর্ব শক্তিমান পরম ব্রহ্মের কাছে আত্মসমর্পণ ৷ যত বেশী ভগবৎ চিন্তা করা যাবে ততই ভগবানের আসল স্বরূপ উদঘাটিত হবে ৷ বৈদিক বিশ্বাস মত তিনিও মনে করতেন মানুষ জন্মসূত্রে পাপী নয় ৷ নয় অছ্যুত ৷ ভুল বা পাপ মানুষ মাত্রেই করে ৷ কিন্তু যদি বোঝে এটা খারাপ আর তার পুনরাবৃত্তি না করার সংকল্প গ্রহণ করে তবে তার আত্মা পরম আত্মার কাছে অর্থাৎ অন্ধকার থেকে আলোয় চলে যাবে ৷ বই পড়ে শিক্ষিত ও পন্ডিত হওয়া যায় তবে ধ্যান ছাড়া প্রকৃত জ্ঞানলাভ অসম্ভব ৷ আর প্রয়োজন চাহিদায় রাশ টানা ৷ টাকা , সম্পত্তি কিংবা প্রতিপত্তির লোভ যেন অন্যের ক্ষতির কারণ না হয় ৷ তাঁর জ্ঞানানন্দ আশ্রমে তাই কখনো জাতি , ধর্ম , বর্ণের ভেদাভেদ করেন নি ৷

এই বিশিষ্ট মহাপুরুষ ১৮৯০ সালের ১২ আগষ্ট সোমবার শুক্লা দ্বাদশী তিথিতে ব্যারকপুরের মণিরামপুর ঘটকপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন ৷

পিতৃদত্ত নাম ছিল “প্রবোধ চন্দ্র ভট্টাচার্য ” ৷ ডাক নাম “হাবু” ৷ এনারা সার্বণ গোত্রীয় রাঢ়ী শ্রেণীর গাঙ্গুলী( গঙ্গোপাধ্যায় ) ব্রাহ্মণ ৷ পিতা রজনীকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন বর্ধমান -বাঁকুড়া সীমান্তবর্তী বাঁকুড়া জেলার গঙ্গারামপুর বামুনিয়ার জমিদার ৷ ইংরেজ আমলে জমিদারী করেও বিদেশীদের পদলেহন করেন নি ৷ বরং স্বাধীনতা আন্দোলনে নানা ভাবে অংশ নিয়েছিলেন ৷মা চন্দ্রভামিনী দেবী গৃহবধূ হয়েও বিদ্যোৎসাহী ও পরম ধার্মিক মহিলা ৷

যিনি অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরী করেছিলেন ৷ তিনি প্রবোধচন্দ্রের অল্পবয়সে বিয়ে দেন রাধারাণী দেবী নামের এক সুলক্ষণা মহিলার সঙ্গে ৷ তারাপদ ও উমাপদ দুই পুত্রের জন্মের পর রাধারাণী মারা যান ৷ মাত্র ২৩ বছরের বিপত্নীক প্রবোধ সেই সময় আধ্যাত্মিকতায় ডুবে যান ৷ তীর্থ পর্যটনে বেড়িয়ে পড়েন ৷ এরপর আবার গুরু কালিকানন্দের আদেশে বাড়ী ফেরেন ৷ বাড়ীর সবার ও গুরুর ইচ্ছায় কালিদাসী দেবীকে বিবাহ করেন ৷ যাঁর গর্ভে দুই ছেলে গৌরীপদ ও রামপদ এবং এক মেয়ে নন্দরাণীর জন্ম হয় ৷ যাঁর মন ধর্মে গিয়েছে তাঁকে সংসারে আটকে রাখা মুশকিল ৷ কালিদাসীর অনুমতি নিয়ে পারিবারিক দেবতা লক্ষ্মী -জনার্দনকে প্রণাম করে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করেন ৷ তখন কাশীতে গুরু কালিকানন্দ তাঁর ঈশ্বর অনুভূতি দেখে নাম দেন “জ্ঞানানন্দ ” ৷ হিমালয়ে তপস্যা করে “সরস্বতী” উপাধি লাভ করেন ৷ সরস +বতী = সরস্বতী ৷ এখানে জ্যোর্তিময় ৷ শঙ্করাচার্যের দশনামী সম্প্রদায়ের অন্যতম “সরস্বতী” ৷স্বরজ্ঞানরতো নিত্যং স্বরবাদী কবীশ্বরঃ ৷ সংসারসাগরাসারহন্তাহসৌ হি সরস্বতী ” এর বাংলা হলো যিনি সর্বদা বেদের স্বরজ্ঞানে রত , স্বরোচ্চারণে নিপুণ ও কবিশ্রেষ্ঠ এবং অসার সংসার সমুদ্রের হন্তা তাঁর নাম “সরস্বতী “৷ রামেশ্বরমের শৃঙ্গেরী মঠের সর্ব্বোচ্চ সন্ন্যাসীদের সরস্বতী , ভারতী ও পুরী উপাধি হয় ৷ এঁরা ভূরিবার সন্ন্যাসী ৷ মহাবাক্য ,”অহ্ ম ব্রহ্মাস্মি “৷ জ্ঞানানন্দ মহারাজ সমগ্র ভারতবর্ষ পদব্রজে (হেঁটে ) তীর্থ পর্যটন করেন ৷ ৫৫ বছর বয়সে সনাতন ধর্মীয় সাধু সন্ন্যাসী ও সাধক সমাজ বাংলা তথা ভারতের অন্যতম এই সাধককে “পরমহংস” উপাধিতে ভূষিত করেন ৷ পরমহংস মানে শুদ্ধমনা সংযত আত্মা ৷যিনি নির্বিকার সমদর্শী ব্রহ্মানন্দাস্বদনকারী যোগ সিদ্ধ পুরুষ ৷”ওঁ সোহহং হংসঃ পরমহংসঃ পরমাত্মা দেবতা ৷ চিন্ময়ং সচ্চিদানন্দস্বরূপং সোহহং ব্রহ্ম ৷”অর্থাৎ আমি সেই জ্ঞানময় সচ্চিদানন্দ স্বরূপ পরব্রহ্ম ৷১৯৭৬ সালের ১৬ জুলাই দুপুর বারোটায় বোলপুর আশ্রমে যাওয়ার পথে উত্তরপাড়া চন্ডীতলায় এক গাড়ী দূর্ঘটনায় জ্ঞানানন্দ পরমহংসদেব পার্থিব শরীর ত্যাগ করেন ৷ আহত হন তাঁর আদরের নাতি ( আমার ভগ্নিপতি) ভোম্বল ওরফে সুশান্ত ( ছোট ছেলে রামপদর বড় ছেলে )৷ নিজে দেহত্যাগ করলেও বাঁচিয়ে দেন নাতিকে অথচ ঠাকুরের দেহেও ছিল না কোন আঘাতের চিহ্ন ! উনি দেহ রাখলে অদ্ভুত আলোয় আলোকিত হয় তাঁর ত্রিবেণীর বাড়ীর গৃহদেবতা “কৃষ্ণ কালী” ৷ ভক্তদের মতে উনি কৃষ্ণকালীতে বিলীন হন ৷ কলকাতার নিমতলা মহাশ্মশানে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সমাধির কাছেই রয়েছে তাঁর এই সমাধি মন্দির ( এই ছবি) ৷

“গৌরহরি জ্ঞানানন্দ , কৃষ্ণ -কালী ,শিব রাম

রাধে শ্যাম সীতারাম ,হরে কৃষ্ণ ,হরে রাম ৷”

ওঁ ভগবতে জ্ঞানানন্দায় নমঃ !

 

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *