সম্ভাব্য বিক্ষোভ অশান্তি এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কায় ২১ জুলাই বন্ধ….।

সম্ভাব্য বিক্ষোভ অশান্তি এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কায় ২১ জুলাই বন্ধ….।

Spread the love

কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ৩০ জুন, ২০২৬। ধর্মতলা চত্বরে আগামী ৬০ দিনের জন্য কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি কলকাতা পুলিশের ! সম্ভাব্য বিক্ষোভ, অশান্তি এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানায় পুলিশ প্রশাসন। কলকাতা পুলিশের কমিশনার অজয় নন্দ ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারার আওতায় এই নির্দেশ জারি করেছেন। এই নির্দেশ কার্যকর থাকবে আগামী ২ জুলাই থেকে ৩০ অগস্ট পর্যন্ত।

পুলিশের নির্দেশ অনুযায়ী, এই সময়ের মধ্যে ধর্মতলার নির্দিষ্ট এলাকায় পাঁচ জন বা তার বেশি মানুষের জমায়েত করা যাবে না। একই সঙ্গে কোনও ধরনের মিছিল, সভা, ধর্না, বিক্ষোভ বা রাজনৈতিক কর্মসূচিরও অনুমতি দেওয়া বন্ধ। শুধু তাই নয়, লাঠি, আগ্নেয়াস্ত্র বা অন্য কোনও বিপজ্জনক অস্ত্র বহনেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এমন কোনও কাজও করা যাবে না, যার ফলে জনশান্তি বিঘ্নিত হতে পারে, সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়তে পারে বা যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি হতে পারে।

কলকাতা পুলিশের দাবি, নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহে ওই এলাকায় হিংসাত্মক বিক্ষোভ বা বড় ধরনের অশান্তির আশঙ্কা আছে ! সেই পরিস্থিতিতে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া।

প্রশাসনের বক্তব্য, ধর্মতলা কলকাতার অন্যতম ব্যস্ত এলাকা। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এই পথ ব্যবহার করেন। সেখানে বড় রাজনৈতিক জমায়েত হলে জনজীবন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটতে পারে। তাই বৃহত্তর জনস্বার্থের কথা ভেবেই এই নিষেধাজ্ঞা জারি।

এই নির্দেশের আওতায় পড়ছে বউবাজার থানা, হেয়ার স্ট্রিট থানা এবং সদর ট্র্যাফিক গার্ডের অন্তর্গত নির্দিষ্ট অংশ। কেসি দাস মোড় থেকে ভিক্টোরিয়া হাউস তথা সিইএসসি দফতর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। তবে বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের জন্য এই নির্দেশ বলবৎ নয় !

পুলিশ আরও জানিয়েছে, এত সংখ্যক মানুষের কাছে পৃথকভাবে নোটিস পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারার উপধারা অনুযায়ী একতরফাভাবে এই নির্দেশ জারি করা। সংবাদমাধ্যম, কলকাতা পুলিশ গেজেট এবং বিভিন্ন থানার নোটিস বোর্ডের মাধ্যমে এই নির্দেশ সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশিত।

এই সিদ্ধান্তের জেরে সবচেয়ে বেশি প্রভাব, ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবসের কর্মসূচির ওপর। প্রতি বছরের মতো এ বছরও ধর্মতলার ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে সভা করার জন্য পুলিশের কাছে অনুমতি চায় কালীঘাট তৃণমূল। একই জায়গায় সভার অনুমতি চেয়ে আবেদন করে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবিরও। কিন্তু কলকাতা পুলিশ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ধর্মতলার মতো ব্যস্ত এলাকায় রাস্তা আটকে কোনও রাজনৈতিক সভা বা কর্মসূচির অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। ফলে দুই পক্ষকেই সভার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা। কারণ, চলতি বছরে তৃণমূলের অন্দরে তৈরি হওয়া বিভাজনের জেরে ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু থেকেই টানাপোড়েন চলছিল। কে ঐতিহ্যবাহী এই কর্মসূচির নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং কোথায় সভা করবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দুই শিবিরের মধ্যে চাপানউতোর চলছিল।

গত রবিবার সেই উত্তেজনা প্রকাশ্যেও দেখা যায়। কালীঘাট তৃণমূলের কয়েকজন নেতা ও কর্মী ধর্মতলার ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে গিয়ে সম্ভাব্য সভামঞ্চের জায়গা চিহ্নিত করতে ফিতে দিয়ে মাপজোকও শুরু করেন। অভিযোগ, ব্যস্ত রাস্তায় এই কাজের ফলে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং সাধারণ মানুষ সমস্যার মুখে পড়েন।

পরের দিন বিধানসভায় এই ঘটনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কীভাবে এত ব্যস্ত রাস্তায় এই ধরনের কাজ করা হল। এরপরই পুলিশ প্রশাসন আরও সক্রিয় হয়। রাস্তা আটকে মাপজোক করার অভিযোগে দোলা সেন, কুণাল ঘোষ-সহ কয়েকজন তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হয়। আর তার পরদিনই লালবাজার জানিয়ে দেয়, ধর্মতলায় ২১ জুলাইয়ের সভার অনুমতি দেওয়া হবে না।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে আপাতত দুই তৃণমূল শিবিরের মধ্যে ২১ জুলাইকে ঘিরে যে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তাতে সাময়িকভাবে ইতি পড়ল। কারণ, একই দিনে একই এলাকায় দুই পক্ষের পৃথক রাজনৈতিক জমায়েতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠার প্রবল সম্ভাবনা বলে প্রশাসনের আশঙ্কা।

এদিকে, এবারের ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচিকে ঘিরে আইনি জটিলতাও রয়েছে। কয়েক বছর আগের একটি মামলার সূত্র ধরে ফের আদালতের নজরে এসেছে এই কর্মসূচি। অভিযোগ ছিল, ২০১৮ সালে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করেই ধর্মতলায় ২১ জুলাইয়ের সভা করা হয়। সেই মামলার শুনানিতে কলকাতা হাইকোর্ট মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নোটিস পাঠানোর নির্দেশ দেয়। রাজনৈতিক মহলের মতে, সেই আইনি প্রেক্ষাপটও প্রশাসনের সতর্ক অবস্থানের অন্যতম কারণ।

সব মিলিয়ে, ধর্মতলায় টানা ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা এবং ২১ জুলাইয়ের ঐতিহ্যবাহী সভার অনুমতি বাতিলকে ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন মোড় ! এখন দুই তৃণমূল শিবির পরবর্তী কর্মসূচি কোথায় এবং কীভাবে আয়োজন করে, সেদিকেই নজর থাকবে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের।

তৃণমূল কংগ্রেস দুই ভাগ হওয়ার পর কংগ্রেসও স্বাভাবিক ভাবে এবার বড় দাবীদার ২১ জুলাই র শহীদ দিবসের। তাই বোধহয়, বলা ভাল দুই পক্ষ নয়, এক ঢিলে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তিন পাখী মারল ! ভবিষ্যতে কি এই নির্দেশের কোন সুদূরপ্রসারী ফল হতে পারে ? আপনাদের কি মতামত, এই নির্দেশ নিয়ে ? গণতন্ত্রের ওপর আঘাত না খেয়োখেয়ি বন্ধ করা ::

 

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *