নানা : বারো মণ কাঠের ওপারে, কী আশ্চর্য হিসাব! একজন তারকার  শেষ সম্পত্তি…।

নানা : বারো মণ কাঠের ওপারে, কী আশ্চর্য হিসাব! একজন তারকার শেষ সম্পত্তি…।

Spread the love

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা।

 

পর্দায় তিনি

কখনও ক্রোধ,

কখনও প্রতিবাদ,

কখনও এক আহত মানুষের

নিঃশব্দ আর্তনাদ।

‘ক্রান্তিবীর’-এর আগুন,

‘প্রহার’-এর শৃঙ্খলা,

‘অগ্নিসাক্ষী’-র ক্ষত—

চরিত্র বদলেছে বারবার,

কিন্তু প্রতিটি চরিত্রের ভিতর

একই মানুষটি দাঁড়িয়ে থেকেছেন—

অন্যায়ের সামনে একা,

মানুষের পাশে নিঃশব্দ।

তেরো বছরের সেই ছেলে

যে আট কিলোমিটার হেঁটে

পোস্টার আঁকতে যেত,

মাস শেষে পেত সামান্য কয়েকটি টাকা—

সেই ছেলেটিই একদিন

সিনেমার পর্দায়

লক্ষ মানুষের কণ্ঠ হয়ে উঠল।

কিন্তু তার চেয়েও বড়

একটি চরিত্র তিনি বেছে নিয়েছিলেন—

মানুষের চরিত্র।

নিজের গাড়ির জন্য

জমানো দেড় কোটি টাকা

একদিন গাড়ি হয়ে ওঠেনি;

হয়ে উঠেছিল

কৃষকের বিধবা স্ত্রীর

চোখের জল মুছে দেওয়ার হাত,

অনাথ শিশুর আগামীকাল,

ভেঙে পড়া ঘরের

একটু দাঁড়িয়ে থাকার সাহস।

সেদিন কোনো ক্যামেরা ছিল না।

ছিল না আলো,

ছিল না করতালি।

ছিল শুধু

মানুষের পাশে মানুষ।

আর ছিল—

এক শ্রমজীবী বৃদ্ধার

ঘামে ভেজা শরীর থেকে বেরিয়ে আসা

মাত্র একশো টাকার একটি নোট।

একশো টাকা!

কারও কাছে যা

এক কাপ চায়ের হিসাব,

কারও কাছে

সেটাই হয়তো সারাদিনের শ্রম।

তবু তিনি দিয়ে দিয়েছিলেন—

নিজের অভাবের মধ্য থেকেও

অন্যের অভাবের দিকে।

সেখানেই

মানবতার আসল অঙ্ক—

যার বেশি আছে সে দিল—

এতে বিস্ময় কম;

যার নিজেরই কম,

সে অন্যের জন্য কিছু রেখে দিল—

সেখানেই মানুষ বড় হয়ে ওঠে।

আর সেই মানুষটি

নিজের জীবনের শেষ সম্পত্তির কথাও

একদিন খুব সহজ করে বলেছিলেন—

বারো মণ কাঠ।

কী আশ্চর্য হিসাব!

একজন তারকার

শেষ সম্পত্তি

কোনো প্রাসাদ নয়,

কোনো দামি গাড়ি নয়,

কোনো ব্যাংক ব্যালান্স নয়—

মাত্র বারো মণ কাঠ।

কিন্তু হয়তো

এই বারো মণ কাঠই

আমাদের সামনে রেখে যায়

সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন—

জীবনে আমরা কতটা জমালাম,

তা কি সত্যিই বড় কথা?

নাকি কতটা বিলিয়ে দিয়ে

মানুষের জীবনে

একটু আলো রেখে গেলাম—

সেটাই আসল?

ভেজা কাঠের ধোঁয়ায়

চোখে জল এলে

কেউ যেন ভুল করে

সেই জলকে ভালোবাসার অশ্রু না ভাবে—

এই রসিকতার আড়ালেও

ছিল এক নির্মম সত্য:

মানুষ চলে যায়,

সম্পদ পড়ে থাকে;

নাম মুছে যায়,

মানবিকতা থেকে যায়।

তাই নানা পাটেকারের

সবচেয়ে বড় সিনেমা

কোনো প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়নি।

তার নাম

মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

তার নায়ক

কোনো চরিত্র নয়—

একজন ক্ষুধার্ত কৃষক।

তার নায়িকা

কোনো পর্দার মুখ নয়—

একজন স্বামীহারা নারী।

তার সংলাপ

কোনো চিত্রনাট্যে লেখা নয়—

একজন দরিদ্র মানুষের

কাঁপা হাতে এগিয়ে দেওয়া

একশো টাকার নোট।

আর তার সবচেয়ে বড় দৃশ্য—

একজন মানুষ

নিজের জন্য রাখা স্বপ্ন সরিয়ে রেখে

অন্য মানুষের বেঁচে থাকার স্বপ্নকে

একটু জায়গা করে দিচ্ছেন।

বারো মণ কাঠ হয়তো

একদিন শেষ হয়ে যাবে,

কিন্তু একজন মানুষের দেওয়া

একটি মানবিক হাত

কত শত জীবনের ভিতর

প্রজন্মের পর প্রজন্ম

জ্বলতে পারে—

তার কোনো হিসাব নেই।

নানা তাই শুধু

একজন অভিনেতার নাম নয়।

তিনি মনে করিয়ে দেন—

তারকা হওয়া বড় কথা নয়,

মানুষ হয়ে ওঠাই

সবচেয়ে কঠিন অভিনয়।

আর সেই অভিনয়ে

কোনো মেকআপ লাগে না,

কোনো ক্যামেরা লাগে না,

কোনো করতালিও নয়—

শুধু লাগে

একটি হৃদয়,

যা নিজের আলো থেকে

অন্যের অন্ধকারে

একটু আলো দিতে জানে।

 

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *