সুদীপা চৌধুরী : মেদিনীপুর, ৩১ আগস্ট, ২০২৫। রাধা-কৃষ্ণ, কৃষ্ণ- রাধা নয় কিন্তু, আর এখানেই এই অসীম অনন্ত প্রেম এই সৃষ্টি এই সংসারে এক দিব্য উজ্জ্বল মহিমান্বিত আনন্দ গাঁথা হয়ে প্রজ্জ্বলিত হল। যিনি সৃষ্টি যিনি বিনাশ যিনি পালন
যিনি লালন এবং তিনি দ্বাপর ক্রেতা সত্য কলি এবং যিনিই ত্রিভুবন তিনিই আবিষ্ট হলেন ‘রাধা’ তে !
একই আত্মার দুই রূপ রাধা-কৃষ্ণ।
এমন প্রেম আত্মার সাথে আত্মার এই যুগল রাধা কৃষ্ণের পক্ষেই সম্ভব। রাধা কৃষ্ণ প্রেম করেছিলেন না প্রেমের জন্ম হয়েছিল রাধা কৃষ্ণের কাছ থেকেই এই যুগলের আখ্যান দেখে বারে বারে মন সে প্রশ্নই করে? একে কি শুধু প্রেম বলা যায়? এ কেমন প্রেম? যেখানে উভয়ের আত্মা একে অন্যতে বিলীন হয়ে রয়েছে কত না যুগ যুগ ধরে। প্রেমের ব্যাখ্যা হয় না। হয় না ভালোবাসার ব্যাখ্যা বা সংজ্ঞা।
কিন্তু এই রাধা-কৃষ্ণ নামটি যেন প্রেমের সমস্ত সংখ্যা বহন করে অনন্তকাল ধরে বয়ে চলেছে প্রতিটি হৃদয় জুড়ে, এটাই তো হওয়া উচিত ছিল এ বিশ্ব সংসারে !
কিন্তু কালিমায় লিপ্ত হৃদয় মায়ার ভেলকিতে ভরা পৃথিবীতে হারিয়ে গেছে সেই অমোঘ প্রেম!
হয়তো অঝোর ধারায় কোথাও কাদঁছে রাধা, কোথাও বা শ্রীকৃষ্ণ, পারেনি সৃষ্টি বহন করতে ,ধরে রাখতে তাদের আত্মার মিলনের মেদুরতা। তলিয়ে গেছে তা, হারিয়ে গেছে তা, হিংসা ঈর্ষা মারামারি খুনোখুনি কাটাকাটিতে। হৃদয় গুলো সব বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে একে অপরের থেকে। তাহলে রাধাকৃষ্ণ তারা কি শুধুই গল্প? শুধুই উপমা? শুধুই ব্রত? আর কিছু নিয়মকানুন? এগুলো তো মেকি, এগুলো তো যান্ত্রিক, এগুলোতো কেবল একটি বিশেষ দিন যাপন।
ঐ অনন্ত প্রেম, ওই আত্মার সাথে আত্মার সংযোগ, ত্যাগের মহিমা, ওই মহাপ্রেম সবই কি বৃথা? পারেনি এই সৃষ্টি তা ধরে রাখতে পারেনি এই জগত সংসার তা আয়ত্ত করতে।
ঈশ্বর কোথায় স্বর্গ কোথায় সবই তো এই পৃথিবীতে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এই মানুষের মধ্যেই তো ঈশ্বর সদা সর্বদা বিরাজমান । সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম আত্মায় তার অবাধ বিচরণ, তাহলে কোথায় হারিয়ে গেল অমন আনন্দ প্রেম, অনন্ত প্রেম?
হারিয়ে গেছে তা চাওয়া পাওয়ার মিছিলে জীবনের জটিল সমীকরণে
জীবনের সাথে জীবনের রেষারেষিতে
এবং নারীর প্রতি অন্যায় অত্যাচার।
রাধা অষ্টমী অর্থে রাধার জন্মজয়ন্তী বা জন্ম তিথি অর্থাৎ অসীম আনন্দের অনন্ত আনন্দের আধার সৃষ্টি। আনন্দদায়িনী শক্তিই হলেন রাধা। রাধা নামেই অনন্ত আনন্দ। নেই যে আনন্দের শেষ। যে আনন্দের ধারক কেবলমাত্র হৃদয়, কিন্তু সেই হৃদয়েই মানুষ ধারণ করে থাকে একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষ রাগ ক্ষোভ দুঃখ। “রা” অর্থে রমন। অর্থাৎ আনন্দ বর্ধনকারী। “ধা” হল ধারন । অর্থাৎ, যিনি আনন্দকে ধারন করে থাকেন তিনিই হলেন #রাধা। আর আনন্দ তিনি তো স্বয়ং
#শ্রীকৃষ্ণ- সচ্চিদানন্দ -সৎ-চিৎ-আনন্দ।
এইতো সহজ সমীকরণ যে মনে আনন্দের বাস সেখানেই শ্রীকৃষ্ণের উপস্থিতি, ঈশ্বরের অস্তিত্ব, মানব প্রেমের বিকাশ।
মানুষের মনের মধ্যে বিষাদ ক্ষণস্থায়ী।
ঈশ্বরের আবাসস্থল আনন্দধাম। তাই মানুষ বেশিক্ষণ দুঃখকে বহন করতে পারে না। কারণ ঈশ্বর খুব বেশিক্ষণ নিজের বাসস্থান থেকে দূরে থাকতে চায় না যে। আমরা যতক্ষণ কাঁদতে পারি তার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে আমরা হাসতে পারি। সৃষ্টির কি অদ্ভুত খেলা গভীর থেকে গভীর শোক আমরা সহ্য করতে পারি, কিছু সময়ের পর তা ভুলে যাই, বা মলিন হয়ে আসে। কিন্তু আনন্দ তা কখনো আমাদের ছেড়ে যায় না, সাথে সাথে থাকেই কোন না কোন ভাবে, কোন না কোন রূপে।
আসলে প্রেম তথা ঈশ্বর আমাদের ছাড়তে চান না আমরাই ঈশ্বরকে ছেড়ে দিতে চাই বলেই নিজেদেরকে অকারণ দুঃখ-দুর্দশায় মুড়ে ফেলি ভুল কাজ করে ভুল পথে হেঁটে।
বিষাদ ভঙ্গ হওয়ার পরে ঐ বিষাদের জায়গায় মনে যে আনন্দের আগমন হয়, সে আনন্দটাকে ধারন করাটাই হচ্ছে #রাধা।
রাধা সৌন্দর্যের প্রতীক, খুশির প্রতীক হাসির প্রতীক, অসীমানন্দের প্রতীক, বিরহ যন্ত্রনাও রাধার কাছে মিলনের প্রতীক। কারণ তিনি আনন্দকে ধারণ করেছেন অর্থাৎ শ্রীকৃষ্ণকে তিনি প্রতিটি সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্ম অনুভবে ধারণ করেছেন। জীবনের প্রত্যেকটি কণায় কণায় তিনি শ্রীকৃষ্ণকে অনুভব করছেন। সবকিছু তেই তার কাছে আনন্দ স্বরূপ শ্রীকৃষ্ণের উপস্থিতি বিদ্যমান।
শ্রীকৃষ্ণের মনে কোন বিষাদ নেই, সুখ ও দুঃখের অবকাশ নেই। তিনি অবিচল ।এক অবস্থায় আনন্দের মধ্যে স্থির থাকেন। তিনি কেবল আনন্দেই বিহার করে চলেছেন আদি অনন্তকাল ধরে। সে আনন্দটাই হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের প্রিয় স্থান। যার মন আনন্দকে ধারন (রাধা) করেছেন সেখানেই শ্রীকৃষ্ণ বিরাজ করেন। সে আনন্দই হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণ পরমাত্মার নিবাস স্থান এই আনন্দময় কোষের মধ্যেই শ্রীকৃষ্ণ পরমাত্মার অংশ স্বরূপ আত্মার অবস্থান। তাই যেখানে আনন্দ সেখানে সচ্চিদানন্দ। আর যেখানে রাধা (আনন্দ ধারন) সেখানেই শ্রীকৃষ্ণ।
যেখানে রাধা নেই সেখানে শ্রীকৃষ্ণও নেই।
যেখানে আনন্দ নেই সেখানে ঈশ্বরও নেই।।
রাধে রাধে

