বিশেষ প্রতিনিধি : কলকাতা, ৮ অক্টোবর, ২০২৫। যে বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিখিয়েছিলেন ধর্মের চেয়ে উৎসব বড়, আর উৎসব মানেই মিলন ও আহারের আনন্দ; যে বাংলায় স্বামী বিবেকানন্দ ধর্মীয় গোঁড়ামিকে রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে মানুষের সেবায় উৎসর্গ করতে বলেছিলেন, আজ সেই মণীষীদের বাংলায় দুর্গাপূজার আবহে দুই তরুণীর সামান্য চিকেন রোল খাওয়া নিয়ে যেভাবে বিদ্বেষ ছড়ানো হচ্ছে, তা দেখে প্রশ্ন জাগে—আমরা কি আমাদের সংস্কৃতির মূল সুরটাই ভুলে যাচ্ছি?
সম্প্রতি দুই বাঙালি ইনফ্লুয়েন্সার, হেমশ্রী ভদ্র এবং সন্নতি মিত্র, দুর্গাপূজার সময় তাঁদের খাওয়াদাওয়ার একটি ছবি পোস্ট করেন। আর তারপরেই যেন ধেয়ে আসে আক্রমণের বন্যা। ভারতের অন্যান্য প্রান্তের নবরাত্রির উপবাসের দোহাই দিয়ে কিছু মানুষ বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যকে অপমান করতে শুরু করেছে। তাঁদের আক্রমণের লক্ষ্য শুধু ওই দুই তরুণী নন, বরং সমগ্র বাঙালি জাতি, আমাদের বাঙালিয়ানা এবং আমাদের আত্মসম্মান। আসলে, যারা নবরাত্রির উপবাসের সঙ্গে বাঙালির দুর্গাপূজাকে গুলিয়ে ফেলেন, তারা আমাদের উৎসবের অন্তর্নিহিত আত্মাটাকেই বুঝতে পারেন না। বাঙালির কাছে মা দুর্গা ঘরের মেয়ে, উমা কৈলাস থেকে বাপের বাড়ি ফেরেন। তাঁর আগমন মানে শোক বা সংযম নয়, বরং অফুরন্ত আনন্দ, ভুরিভোজ এবং উদযাপন। এই উৎসবে ভোগ, প্রসাদ, আড্ডা আর খাওয়াদাওয়াই হল আসল উপাসনা। এখানে আহার কোনো পাপ নয়, বরং উৎসবের এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
হেমশ্রী ভদ্র এবং সন্নতি মিত্র নতুন কিছু করেননি; তাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এক জীবন্ত সংস্কৃতিরই প্রতিচ্ছবি। কলকাতার রাস্তায় পূজার সময় হাতে রোল নিয়ে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরা—এই তো আমাদের চেনা ছবি। এই ছবিকে যারা অপমান করে, তারা আসলে এক অজুহাত খোঁজে। আসল উদ্দেশ্য হল বাঙালির খাদ্যাভ্যাস, তার জীবনযাপন এবং তার স্বতন্ত্র পরিচয়কে খর্ব করা।
সময় এসেছে এই আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার। চিকেন রোল বা মটন কষা—এগুলো শুধু খাবার নয়, এগুলো বাঙালির দুর্গাপূজার ঐতিহ্যের অংশ, আমাদের আনন্দের প্রকাশ। যারা এই সহজ আনন্দকে সংকীর্ণ ধর্মীয় গোঁড়ামির চশমায় দেখে খর্ব করতে চায়, তারা আসলে বাঙালির আত্মসম্মানেই আঘাত হানতে চায়। বিবেকানন্দ বা রবীন্দ্রনাথের বাংলা এই আক্রমণ মেনে নেবে না।

