ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ২৫ অক্টোবর, ২০২৫। প্রাণীর শরীরের প্রতিটি কোষে রক্ত সঞ্চালন দরকার ৷ রক্তের মাধ্যমে কোষে কোষে অক্সিজেন পৌঁছায় ৷ মস্তিষ্কের ভিতরে রক্তপাত হয়ে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যাঘাত ঘটলে মস্তিষ্কের কোষগুলি নষ্ট হয়ে দ্রুত যে অবস্থার জন্ম নেয় তাই “স্ট্রোক” ৷রক্তনালী বন্ধ হয়ে বা ছিঁড়ে সাধারনত স্ট্রোক হয় ৷ রক্তে থাকে অক্সিজেন ও পুষ্টিগুণ ৷যার অভাবে মস্তিষ্কের কোষ বা টিস্যুগুলি মারা যায় ৷সারা দেহের রক্তের মাত্র দু শতাংশ মস্তিষ্ক ব্যবহার করে ৷ কিন্তু , ঐ স্থান অতিমাত্রায় সংবেদনশীল ৷ অক্সিজেন বা শর্করা সরবরাহে সমস্যা মানে খুব
তাড়াতাড়ি এসব কোষনষ্ট হওয়া ৷ এতে দ্রুত রোগীর মৃত্যু হতে পারে নচেৎ শরীরের যে অংশ নিয়ন্ত্রণ করত তা পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা প্যারালিসিস হয়ে যেতে পারে ৷ মস্তিষ্কে রক্ত ক্ষরণ বা এলাকা ভিত্তিক রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়া দু ক্ষেত্রেই উপসর্গ মোটামুটি একরকম ৷
ইস্কিমিক স্ট্রোকে রক্তনালী বন্ধ হয়ে যায় ৷ অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ধমনীর মধ্যে দেওয়ালে চর্বি বা কোলেস্টেরল জমে ৷ চিকিৎসা বিজ্ঞানে তাকে বলে ‘আথেরোস্কেলরোসিস ‘৷ অনেক ক্ষেত্রে এ থেকে চাকলা বা প্লাক খসে গেলে রক্ত চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যায় ৷ আবার রক্তের জমাট ডেলা বা ক্লট এসে মস্তিষ্কের রক্তনালীর পথ রুদ্ধ করে থ্রম্বোটিক স্ট্রোক হয় ৷ হার্টের কিছু অসুখেও এমনটা হয় ৷ আশি ভাগ স্ট্রোকই এ ধরণের ৷ টি আই এ বা ট্রানসিয়েন্ট ইস্কিমিক এটাকের লক্ষণ এবং অসুবিধা কয়েক মিনিট থেকে চব্বিশ ঘন্টা থাকে ৷ অন্যরকম অর্থাৎ হেমারেজিক স্ট্রোক হয় রক্তনালী ফেটে বা চিরে গেলে ৷ রক্তনালী নরম ও ফোলা যাকে এনিউরিজম বলে এবং দূর্ঘটনায় মাথায় আঘাত লাগলেও হেমারেজিক স্ট্রোক হয় ৷মস্তিষ্কের ভিতর রক্তক্ষরণ হলে তাকে ইন্ট্রাসেরিব্রাল হেমারেজ এবং মস্তিষ্কের তিন আবরণী পায়া , এরাকনয়েড ও ড্যুরায় রক্তক্ষরণ হলে তাকে সাব এরাকনয়েড বা সাব ড্যুরাল হেমারেজিক স্ট্রোক হয় ৷ স্ট্রোক মস্তিষ্কের যে দিকে হয় তার বিপরীত দিকের অঙ্গ অসাড় হয় ৷ ব্রেন স্টেম স্ট্রোকে দেহের দুদিক অসাড় হয় ৷ হেমারেজিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কের ভিতরের চাপ কমানোর ওষুধ দিতে হয় ৷ দরকারে করতে শল্য চিকিৎসা৷ রোগীকে সুস্থ ও স্বাভাবিক করতে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা অপরিসীম ৷ বিভিন্ন রকম ব্যায়ামে জড়তা কম বেশি কাটে ৷ হঠাৎ তীব্র মাথার যন্ত্রণা , বমি , খিঁচুনি ,মাথা ঘোরাতে ও শরীরের ভারসাম্য রক্ষায় অসুবিধা হওয়া , অবশ ,দূর্বলতা , শরীরের এক দিক অকেজো হওয়া দেখা যায় ৷ আমাদের কাছে চোখ দেখাতে এলে বলে চোখে ঘোলা দেখছে , অন্ধকার লাগছে বা সব কিছু দু’টি দেখছে ৷ধমনী – শিরার অদ্ভুত সংমিশ্রণ , ধমনীর দূর্বল অংশ ফেটে গিয়ে( Ruptured Aneurysm) হতে পারে ৷ হঠাৎ দারুন ঘাম , জিভ শুকিয়ে যাওয়া , কথা জড়িয়ে যাওয়া হয় ৷ শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে গেলে ,হাসতে গেলে মুখের একপাশ অসাড় বা ফ্যাকাশে লাগলে বা বেঁকে গেলে স্ট্রোক হয়ে থাকতে পারে ৷ আমরা চিকিৎসকরা রোগীকে বলি দু হাত বাড়াতে ৷ যদি কোন হাত ব্যালেন্স না রাখতে পারে নিচের দিকে নেমে যায় স্ট্রোকের কথা ভাবতে হয় ৷কথা বলতে হঠাৎ করে শব্দ আটকে যায় তবে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত ৷
প্রথম কয়েক ঘন্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ ৷ যত দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যাবে তত সুস্থ হওয়ার আশা ৷আমরা ডাক্তাররা বলি FAST কথাটি ৷ এখানে F হলো Face মুখ বেঁকে যাওয়া , A অর্থে Arm হাত অবশ হওয়ি , S বলতে Speech কথা বন্ধ হওয়া কিংবা স্লারিং অফ স্পিচ বা কথা জড়িয়ে যাওয়া আর আগেই বলেছি T মানে Time সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৷যত দ্রুত কাছাকাছির হাসপাতালে পৌঁছানো ৷ সম্ভব রোগীর আগের চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র সহ ৷ তার আগে গায়ের জামা কাপড় , অন্তর্বাস , বেল্ট খুলে দিতে হবে ৷ রোগী অজ্ঞান হলে মুখে কিছু আটকে আছে কিনা দেখতে হবে ৷ ভিতরে কিছু থাকলে বের করে ভেজা কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করে দিতে হবে ৷তবে , একসময় প্রচলিত কিন্তু অবৈজ্ঞানিক হাতের আঙুল , কানের লতিতে সূঁচ ফোটানো যাবে না ৷ দ্রুত হাসপাতালে গেলে রক্তনালীর ব্লক তুলে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধির জন্য ইন্ট্রাভেনাস থ্রম্বোলাইসিস সহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেন ৷ দেরী হলে ক্যাথিটার দিয়ে রক্তনালীতে ক্লট হওয়া মানে জমাট বাঁধা রক্ত অপসারণ করতে থ্রম্বেকটমি করতে হয় ৷খুব বেশি ক্ষতি হলে মাথার হাড় কেটে অর্থাৎ ডিকম্প্রেস ক্র্যানিয়াকটমি করতে হয়৷
“স্ট্রোক” বিশ্বের তৃতীয় ঘাতক ব্যধি ৷ প্রতি ৬ সেকেন্ডে ১জন এতে আক্রান্ত হচ্ছে ৷ বছরে ৮ কোটি লোক সারা পৃথিবীতে আক্রান্ত হয় ৷ আর ২ কোটি মানুষের মৃত্যু হয় ৷ এছাড়া দেড় কোটি লোক পঙ্গুত্ব বরণ করে ৷পঞ্চাশ লক্ষ মানুষ স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়ে যায় ৷ পঁচিশ বছরের বেশি বয়সীদের চার জনের মধ্যে এক জনের স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা থাকে ৷ বিশ্বে আক্রান্তদের ৫ কোটির বেশী মধ্যবয়সী ৷ ৬০ বছরেরে ঊর্দ্ধে স্ট্রোকের আশঙ্কা বাড়লেও যত দিন যাচ্ছে মারক ব্যধিটি যুব এমনকি শিশুদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে ৷ ষাট ঊর্দ্ধে প্রতি দশ বছর অন্তর স্ট্রোকে ঝুঁকি বাড়ে ৷অনেকের মাইল্ড স্ট্রোক বা প্রি স্ট্রোক হয় ৷ এটা ২৪ ঘন্টা স্থায়ী হলেও ঝুঁকি জানান দিয়ে যায় ৷ তখনই সাবধান হতে হবে ৷নারীদের তুলনায় পুরুষদের স্ট্রোক বেশি হয় ৷সর্বশেষ জরিপে দেখা যায় প্রতি ৬ জনে ১ জনে স্ট্রোক হওয়ার ঝুঁকি থাকে ৷
আর আক্রান্ত রোগীর ৪০ ভাগ মারা যায় ৷ এবং ৩০ ভাগ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন ৷ যে কোন বয়সেই এই রোগ হতে পারে ৷ ভারতে ব্রেন স্ট্রোকে
আক্রান্তদের বয়স ৪০ বছরের কম ৷শরীরের অসুস্থতা এখন আর বয়স মেনে হচ্ছে না ৷ অবসাদ , উচ্চ রক্তচাপ , উচ্চ এল ডিএল কোলেস্টেরল, ওজন বেশী , ধূমপান , মদ্যপান , জর্দা , মানসিক চাপ , ঘুম কম হওয়া , চুপচাপ বসে থাকা বা একটানা চেয়ারে বসে কাজ করা ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় ৷ পঁয়ষট্টি বছরের কম বয়সীদের স্ট্রোকে মৃত্যু চল্লিশ ভাগ হয় ধূমপানের জন্য ৷ নিয়মিত উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খেয়ে ১২০ বা ১৩০/ ৮০ এম এইচজি রাখতে হবে ৷ওজন কমাতে হবে ৷দীর্ঘদিন ধরে বেশী সুগার থাকলে শিরা ও উপশিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৷ অনেক সময় বোঝা যায় না ৷ তাই ডায়াবেটিসের মত নিঃশব্দ ঘাতককে বশে রাখতে ওষুধ ও খাবার ঠিকমত খেতে হবে ৷ গ্রামে তো বটেই ভারতের মেট্রো শহরগুলিরও স্ট্রোক সম্বন্ধে ধারনা খুব ক্ষীণ ৷ স্ট্রোক ও হৃদরোগের তফাৎ জানা নেই অধিকাংশ মানুষের ৷ বড় শহরগুলির মধ্যে বেঙ্গালুরুর ৬৮%( মেট্রো শহরগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশী) ব্রেন স্ট্রোক বোঝেন ৷ রাজধানী দিল্লীর ৩৮% আর সবচেয়ে কম সচেতন হায়দ্রাবাদের মানুষ ৷অসচতেনতা স্ট্রোক ডেকে আনে ৷ তাই , প্রতিবছর ২৯ অক্টোবর World Heart Federation ও NCD Alliance র উদ্যোগে সারা বিশ্বে পালিত হয় ” বিশ্ব স্ট্রোক দিবস ” ৷২০০৪ সালে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার নগরীতে World Stroke Congress প্রথম সিদ্ধান্ত নেয় আপামর জনগনকে সজাগ করতে একটা দিন স্ট্রোক দিবস হিসাবে পালন করা হবে ৷ ২০০৬ সাল থেকে তা পৃথিবী জুড়ে পালিত হচ্ছে ৷ যার উদ্দেশ্য স্ট্রোক নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি ও নিবারণের উপায় সম্বন্ধে ধারণা দেওয়া ৷স্ট্রোকে সবচেয়ে জরুরী সময় ৷
যত তাড়াতাড়ি চিকিৎসা হবে তত কম ক্ষতি হবে ৷আবার সচেতনতা ৮০% ক্ষেত্রে স্ট্রোক হওয়া আটকাতে পারে ৷তাই , সাধ্য অনুযায়ী পরিশ্রম করুন ,শরীরচর্চা , হাঁটা, পর্যাপ্ত ঘুম স্বাস্থ্যকর খাবার ফল ও সব্জি বেশী করে খান ৷ মনে রাখবেন খাওয়ার জন্য বাঁচা নয় ৷ বাঁচার জন্য খাওয়া ৷ আধুনিক জীবনচর্চা আমাদের ভোগবাদী করে তুলেছে ৷ লোভ -লালসা বেড়েছে ৷ ফার্স্টফুড , জাঙ্ক ফুড , তেল ঘি , লবণাক্ত খাবার ,মাংস – চর্বি খাওয়া বেড়েছে ৷ মধ্যবিত্ত এমনকি মহিলাদের মধ্যেও ঢুকে পড়েছে মদ্যপান ও ধূমপানের অভ্যাস ৷ যা এখন আভিজাত্যের সমার্থক ৷ মানুষ পরিশ্রম বিমুখ ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে ৷ বেশী পাওয়ার আকাঙ্খা মানুষকে আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে ৷রক্তচাপ , রক্তে চর্বির আধিক্য , ওজন ও সুগার নিয়ন্ত্রণ দরকার ৷বংশগতির কারন থাকলে আগে থেকে সাবধান হতে হবে ৷ আধুনিক জীবনচর্চার ফল বলা হলেও রোগটি সুপ্রাচীন ৷ আয়ুর্বেদে একে
সন্ন্যাস রোগ বলা হয়েছে ৷ খ্রিঃপূঃ ৪০০ অব্দেও এই রোগ ছিল ৷ তা হিপোক্রিটিসের লেখা পড়ে জানা যায় ৷ তবে ,ব্যাপকতা ক্রমঃবর্ধমান ৷

