প্রিয়রঞ্জন কাঁড়ার : কলকাতা, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। সোশ্যাল মিডিয়ায় নিমজ্জিত সময়ে আমরা সিনেমা হল-এ কোনও ছবি দেখতেও ঢুকি বেশ কিছু প্রেজুডিসের বোঝা ঘাড়ে চাপিয়ে। পরিচালক রঞ্জন ঘোষের ‘অদম্য’ একটি ‘রাজনৈতিক ছবি’, এই পূর্বধারণা নিয়েই গিয়েছিলাম। অতি বাম রাজনৈতিক মতাদর্শ সমকালে কতটা প্রাসঙ্গিক, বিপ্লব ও সন্ত্রাসের সীমান্তরেখা নির্ণয়ের মাপকাঠি কী, এসব নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক তরজা যথারীতি চোখে পড়েছে আগেই। কিন্তু আমার মনোভাব স্পষ্ট ছিল। রঞ্জনদার পরিচালক সত্তার দক্ষতার সঙ্গে আমি পরিচিত। অতএব প্রাণ ভরে ছবিটির শিল্প মাধুর্য উপভোগ করবো আর যদি কোনও রাজনৈতিক স্লোগান বা হোর্ডিং পছন্দ না হয়, তাহলে সেটাকে উপেক্ষা করবো। কিন্তু এই ছবি কোনও সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের ধ্বজাধারী নয়৷ বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের অবদমন ও শোষণের সামনে দাঁড়িয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বতঃস্ফূর্ত ও সহজাত প্রতিক্রিয়া। মানবিক আবেগের টানে সেই প্রতিক্রিয়ায় সামিল শহুরে পলাশরা। সারা পৃথিবী জুড়ে রাজনীতি ও শিল্প-সাহিত্যে “ভুল পথের সঠিক পথিক”-এর ধারণা স্বীকৃত। বাজিগরের ভিকি মালহোত্রার মতো কল্পচরিত্রই হোক, বা বাস্তবের কমরেড চারু মজুমদার, দিনের শেষে মানুষের হৃদয়ের আতিথ্য পেতে এঁদের অসুবিধা হয়নি কখনও। অতএব রঞ্জনদা বেকসুর খালাস!
পলাতক পলাশের চোখ দিয়ে আমরা চলমান জীবনকে দেখি। সংকল্প, সংশয়, স্বপ্ন, সংগ্রাম, তুলাযন্ত্রে সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ান এবং আগামীর শপথ। কিছু কিছু দৃশ্যকল্প অসাধারণ দক্ষতায় নির্মিত। সুন্দরবনের পা ডুবে যাওয়া পাঁক থেকে যাত্রা শুরু করে গ্রামীণ মেঠো পথ হয়ে নাগরিক রাজপথে পদাতিকের একজোড়া পায়ের জার্নি যেমন। শুরুতে বাস্তব মনে হয়, কিন্তু জার্নির অন্তিম প্রহরে দর্শক বুঝতে পারে, এটা হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু আসলে হয়নি। ওই যে সাহিত্যের চিরন্তন রোম্যান্টিকতা, “Longing for the unattainable.” যে যাত্রা কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য বা পরিণতি অর্জন করে নেয়, তার সাহিত্য-মূল্য বা শিল্প-মূল্য শূন্য! সম্পূর্ণ বিশ্ব-সাহিত্যই তো আসলে অধরা মাধুরীর অনুসন্ধান। যে মাধুরী একবার মানুষের হাতের মুঠোয় ধরা পড়ে যায়, শিল্পের আঙিনায় তার আর প্রবেশাধিকার থাকে না।
আজও বাঙালি জীবনে “Aparna Sen presents” এই ট্যাগটা কতটা আবেদন সৃষ্টি করে, সেটা কয়েক জন দর্শকের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম। তিনি সরাসরি ছবিতে নেই, আবার সম্পূর্ণ ছবি জুড়েই আছেন।
সবশেষে আসি আসল কথায়। লো-লাইট এবং নাইট মোড ফটোগ্রাফি। এই ছবির সম্পদ। প্রতিটি ফ্রেমের কম্পোজিশনে আলো-ছায়ার যুগলবন্দি একের পর এক কবিতা লিখে গিয়েছে। সাম্প্রতিক কোনও বাংলা ছবিতে এত ভালো ক্যামেরার কাজ আমার অন্তত চোখে পড়েনি। ক্যামেরার পিছনে অর্কপ্রভ দাসের পারফরম্যান্স ছাড়া এই ছবি অসম্পূর্ণ থেকে যেতো।

