রক্তাল্পতা ( Anaemia)!
——————————-
ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫। রক্তে কোন কারণে লোহিত রক্তকণিকা (RBC) ও হিমোগ্লোবিন কমে গেলে এই রোগ হয় ৷ মানুষের রক্তে লোহিত ,শ্বেত রক্ত কণিকা ও অণুচক্রিকা থাকে ৷এর মধ্যে লোহিত রক্তকণিকা অক্সিজেন ও হিমোগ্লোবিন বহন করে ৷ তাই রক্তের এই অসুখে রক্তের অক্সিজেন বহনক্ষমতা কমে যায় ৷ যেহেতু হিমোগ্লোবিন রক্তের অক্সিজেন পরিবহণ করে তাই এর পরিমাণ কম হলে সর্বত্র অক্সিজেনের কম বেশি ঘাটতি হয় ৷ আমাদের মত নিম্ন আয়ের দেশে এমনিতেই জনসংখ্যার বৃহদাংশ রক্তাল্পতায় ভোগেন ৷ তাই মহিলা এবং শিশুদের ও দীর্ঘস্থায়ী রোগ আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে হিমোগ্লোবিনের ঘাটতি বেশি দেখা যায় ৷ হেমোরয়েডস বা পাইলস , কিডনি রোগ , অতিরিক্ত ঋতুস্রাব , পেটের আলসার, ডায়াবেটিস , ক্যান্সার ,লুপাস রোগ থেকে এনিমিয়া হতে পারে ৷ এই রোগে অক্সিজেনের ঘাটতির জন্য ক্লান্তি , দূর্বলতা , অবসন্নতা বা ঝিমুনি ভাব , দেহে ফ্যাকাশে ভাব , চোখের ভিতরের মাংশপেশির রঙ লালের বদলে ফ্যাকাশে হওয়া , চোখের সামনে অন্ধকার লাগা , ট্রাকিকার্ডিয়া বা দ্রুত হৃদস্পন্দন , জিভ মসৃণ হয়ে যাওয়া ,ওজন কমে যাওয়া , চুল পড়ে যাওয়া ,মেজাজ খিটখিটে হওয়া , অবসাদ হওয়া , স্নায়বিক ও শারীরিক দূর্বলতা , কর্মে অনীহা , শ্বাস কষ্ট , বুকে ব্যথা , হাত -পা ঠান্ডা হওয়া , ঘেমে যাওয়া , মাথার যন্ত্রণা,স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়ার মত নানা উপসর্গ দেখা দেয় ৷
তখন আমরা চিকিৎসকগণ কিছু রক্ত পরীক্ষা করে রোগ সম্বন্ধে নিশ্চিত হই ৷ রক্তাল্পতা বিশ্বের সবচেয়ে বড় পুষ্টি সমস্যা৷ তবে , পুষ্টির অভাব বড় কারণ হলেও ধনীর ঘরেও রোগটি হতে কম খাওয়া , জাঙ্ক ফুড , নিউট্রিয়াস খাবার না খাওয়া ও সংক্রমণ থেকে যথাযথ পুষ্টি না পাওয়ায় এ রোগ হতে দেখা যায় ৷ নিরামিষাশীদের মধ্যে এনিমিয়া বেশি থাকে ৷ এই রোগের অনেক রকমভেদ আছে ৷ লোহা ও ভিটামিন কমে গেলে হয় যথাক্রমে আয়রণ ডেফিসিয়েন্সি ও ভিটামিন ডেফিসিয়েন্সি রক্তাল্পতা ৷ এছাড়া রক্ত হ্রাস পেলে ব্লাড লস আবার পারনিয়াস , এপ্লাস্টিক ,সিকেল সেল ,বংশ গত ব্যাধির জন্য হিমোগ্লোবিন উৎপাদনে বাধা যেমন থ্যালাসেমিয়া , অটোইমিউন ডিসঅর্ডারের জন্য ভিটামিন বি-১২ শোষণে অপারগতা , ফোলিক এসিডের ঘাটতিতে মেগালোব্লাস্টিক এনিমিয়া , দূর্ঘটনা জনিত কারণ সহ বিভিন্ন রকমে রক্তাল্পতা হতে পারে ৷ এসব ক্ষেত্রে অনেক সময় জন্ডিস , জ্বর , ডায়েরিয়ার মত সমস্যা হয় ৷ গর্ভাবস্থায় ভারতবর্ষে অর্ধেক মা রক্তাল্পতায় ভোগেন ৷ লোহা , ফলিক এসিড , ভিটামিন বি -১২ র অভাবে এই রোগ হওয়ায় গর্ভবতীর জন্য সরকারী ব্যবস্থপনায় হাসপাতাল থেকে বা আশা কর্মীদের মাধ্যমে আয়রন , ফলিক এসিড বড়ি সহ কিছু ওষুধ দেওয়া হয় ৷ ”
এনিমিয়া মুক্ত ভারত ( AMB)” মহিলা , শিশু ও কিশোরীদের এসব ওষুধ দিয়ে এবং ডিজিটাল পদ্ধতিতে এনিমিয়া দেখে তাদের স্বাস্থ্য পরিবর্তনের দিকে লক্ষ্য রাখেন ৷ হিমোগ্লোবিনোপ্যাথি ও ফ্লুরোসিসের মত কারণ দূর করার চেষ্টা করেন ৷ ঘন ঘন বাচ্চা হওয়া , কম বয়সে গর্ভাধান , কম ওজন ছাড়া , ক্লান্তি , দূর্বলতা , বিষণ্ণতা ,বিলম্বিত ভ্রূণের বৃদ্ধি , হৃদরোগ থাকলে ঝুঁকি বাড়ে ৷লোহা , ফলিক এসিড, ভিটামিন বি-১২ সম্পূরক দিয়ে কাজ না হলে ইন্ট্রাভেনাস আয়রন থেরাপি ও রক্তদান করতে হতে পারে ৷ ক্যানসার রোগীদের কেমোথেরাপি , অনেক অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে চিকিৎসা হয় ৷ কাউকে কৃত্রিম এরিথ্রোপ্রোটিন একরকম প্রোটিন কিডনিতে ইনজেকশন দিয়ে তৈরী করে দিতে হতে পারে ৷ রক্তবিজ্ঞানী হেমাটোলজিস্টরা বলেন রক্তল্পতা দেখা দিলে চা , কফি , আঙুর , কলা , কিউয়ি , দই , দুধ , পনির , পালং শাক , কুলেখাঁড়া শাক , ব্রকলি ,সয়াবিন , বাদাম , বেদানা , পেস্তা , চিয়া বীজ , কুমড়োর বীজ ,সূর্যমুখীর বীজ , টমেটো ,বিট , আপেল , ডিম , লাল মাংস , মেটে ,চিংড়ি মাছ , কাঁচকলা , থোঁর , ডুমুর , সজিনা , পটল , মুগ ডাল ,রুটি , সিরিয়াল , সামুদ্রিক খাবার , এলোভেরার সরবত , ভিটামিন -সি সমৃদ্ধ বিভিন্ন রকম লেবু , আমলকি সহ টক ফল ভালো কাজে আসে ৷ আয়ুর্বেদে এনিমিয়াকে বলা হয় “পান্ডু রোগ “৷ চরক সংহিতা পড়ে দেখেছি এই রোগ পাঁচ ধরণের ৷ অবস্থাভেদে পঞ্চকর্ম , কৃমিহর ও বিভিন্ন দোষের চিকিৎসা করা হয় ৷ লৌহাসব , দ্রাক্ষাসব , মন্ডুর ভস্ম , আরোগ্য বর্ধিনী বটি , নরায়স চূর্ণ দেওয়া হয় ৷ মহামতি চরক বলেছেন এরোগে গোমূত্র , হরীতকী , মধুর সঙ্গে যষ্টিমধু , ভৃঙ্গরাজ , পূনর্ণভা , গুলঞ্চ , হরিদ্রা( হলুদ) , কটকি , ভূমি আমলকী প্রয়োগের সুপারিশ করেছেন ৷আরেকটি সুপ্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি ইউনানী ৷ আমাদের এই শরীর হাওয়া ( বায়ু), মাকূল ও মাশরুব( খাবার ও পানীয়), হরকাত- ও -সাকুনই – জিসমিয়া ( শারীরিক ব্যায়াম ও বিশ্রাম ) , হরকাত -ও-
সুকুন -নাফসানিয়াহ( মানসিক পরিশ্রম ও বিশ্রাম) নাইউম -ও – ইকজাহ্ ( ঘুম ও জেগে থাকা) এবং ইহতেবাস এবং ইস্তিফ্রাগ( ধারণ ও মলত্যাগ) এর উপর নির্ভর করে ৷ ইলাজ-বি- দাওয়া অনুসারে এর উপর এনিমিয়া সহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করা হয় ৷আমি একজন চিকিৎসক হিসাবে যদি দেখি রোগীর নখের আকৃতি চামচের মত বা কোইলোনিচিয়া আবার দেখি পিকা বা মাটি , চক এসব অখাদ্য খাওয়ার ইচ্ছা তখন ভাবি লোহা ঘটিত রক্তাল্পতায় ভুগছে ৷ গ্যাস্টিক কারণ হলে উদরাময় , গা বমি বমি থাকে ৷
ক্ষতিকর এনিমিয়ায় অঙ্গ প্রত্যঙ্গের অসাড়তা খুঁজে পাই ৷ বিভিন্ন রোগ নিয়ে সবিস্তারে জানতে আমার লেখা বই পড়ুন ও পড়ান ৷সচেতনা পারে অধিকাংশ এনিমিয়া সাড়াতে ৷কলকাতায় হয়েছে এনিমিয়ায় হোমিওপ্যাথির কার্যকারিতা নিয়ে ফেজ টু ট্রায়াল ৷ হোমিওপ্যাথিতে ম্যালেরিয়ার পর দীর্ঘমেয়াদী রক্তশূন্যতায় , হাঁটা -চলা ও কথা বলায় কষ্টে নেট্রাম মিউর , আর্সেনিক এল্বামা, এলেস্টোনিয়া স্কোলারিস , হাত -বাহু অসাড় ভাব থাকলে যারা ঠান্ডা খেতে পছন্দ করে তাদের ফসফরাস , সূঁচের মত শিহরণ , খুব দূর্বল লাগা থাকলে পিক্রিক এসিড , পূষ্টির ব্যাঘাতে, কোষ্ঠকাঠিন্যে এলুমিনা , নাক্স ভম , ক্যালকেরিয়া ফস , আঘাত , রক্তপাত , অতিরজঃ , ফ্যাকাশে চেহারা ইত্যাদি লক্ষণে চায়না , ফ্যাকাশে দূর্বল , মাথাঘোরা , কানে শব্দ , শ্বাসকষ্ট ও বুক ধড়ফড়ের সাথে শরীর ঠান্ডা থাকলে ফেরাম মেটালিকাম , গর্ভাবস্থায় ফেরাম মেট বা ফস ,মহিলাদের অতিস্রাব , দূর্বলতা ও ক্লান্তিতে এলেট্রিস ফারিনোসা প্রভৃতি ওষুধ লক্ষণ ভেদে বেশ নিরাপদ ও কার্যকর৷
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : ছবি গুগল।

