সুদীপা চৌধুরী: মেদিনীপুর, ১ অক্টোবর, ২০২৫। মহাশক্তির আরাধনা বলে কথা! তাই নির্দিষ্ট নির্ঘণ্ট মেনে পালন করতে হয় নির্দিষ্ট আচার সহ। একটুও এদিক-ওদিক হওয়ার উপায় নেই। কথায় আছে দুর্গাপূজা করা চারটি খানিক কথা নয়। এতটাই কঠিনই পূজা যে একটি পদ্মের অভাবে শ্রী রামচন্দ্র নিজের নেত্র দিতে উৎগ্ৰীব হয়ে উঠেছিলেন। মহামায়ার আরাধনা খুব সহজ নয়। নিজের আত্মাকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধন মুক্ত করে কেবলমাত্র তার স্মরণ করলেই তার সাড়া পাওয়া সম্ভব।
চারদিন ব্যাপী পূজার সূক্ষ্ম থেকে অতি সূক্ষ্ম নিয়মগুলি পালন করতে তৎপর হয়ে ওঠেন প্রতিটি পূজার ক্ষেত্র। মন্ত্র উচ্চারণ থেকে শুরু করে, একের পর এক রীতি নীতি গুলি চেষ্টা করা হয় নিষ্ঠার সহিত পালন করার, ভুল ত্রুটি না রেখে পালন করার।
১)কল্পারম্ভ: ‘কল্প’ অর্থাৎ সংকল্প। ‘আরম্ভ’ অর্থে শুরু। সুতরাং ‘কল্পারম্ভ’ হল এমন এক মুহূর্ত যখন সংকল্প নিতে হয় যে, পুজোর ক’দিন নিষ্ঠা সহকারে নিয়মাবলী পালন করা হবে। মহাষষ্ঠীর সকালে মণ্ডপের এক কোণে ঘট স্থাপন করতে হয়। দেবীর আরাধনায় যে পবিত্র সংকল্প করা হয়, ঘট হল তার সাক্ষী।
মহাষষ্ঠীর কল্পারম্ভকে বলা হয় ‘ষষ্ঠ্যাদি কল্পারম্ভ’।
২)বোধন: পঞ্জিকা মতে, মহাষষ্ঠী পড়ে গেলে তার গোধূলি লগ্নে হয় বোধন। ‘বোধন’ অর্থে জাগরণ। যেহেতু আশ্বিন মাসে সূর্যের দক্ষিণ আয়ন হয়, অর্থাৎ দেবতাদের রাত্রিকালীন সময়ে তাই তারা নিদ্রামগ্ন থাকেন। ঋষি ব্রহ্মার কথায়, শ্রীরামচন্দ্র রাবণ বধের জন্য এই অসময়ে অর্থাৎ অকালে মাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন বা জাগিয়েছিলেন। তাই এই অকালবোধন শারদীয়া পূজোর ক্ষেত্রে অতি অবশ্যম্ভাবী।
তাই মহাশক্তি মহামায়াকে জাগাতে এই আচার পালিত হয়। একটু বিশদে গেলে বোঝা যায় যে মহাকাব্য রামায়ণ আসলে শারদীয়া দুর্গাপূজা এবং দীপাবলির, সূচনা এবং শেষ। যদিও এর আগেও বহু পুরা কাল হতে দুর্গাপূজার চলছিল তবে তা ভিন্ন নামে এবং ভিন্ন ভাবে। আসলে সারা বছর জুড়েই দুর্গাপূজা হয়ে থাকে বিভিন্ন মত অনুসারে।
৩)আমন্ত্রণ ও অধিবাস: দেবীকে জাগানোর পরের পর্ব হল আমন্ত্রণ ও অধিবাস।
‘আমন্ত্রণ’ অর্থে পুজো গ্রহণ করার আবেদন। অর্থাৎ দেবীর উদ্দেশে যা উৎসর্গ করা হবে, তা যেন তিনি তুষ্ট মনে গ্রহণ করেন। নইলে অকল্যাণ হবে যে!
‘অধিবাস’ অর্থাৎ বসত করা। লাল সুতো দিয়ে চারটি কঞ্চির মাথা বেঁধে দেওয়া হয়। এটা হল এমন এক গণ্ডি, অশুভ শক্তি যার বাইরে থাকবে। অন্দরে থাকবেন মহাশক্তি। অধিবাসে বিল্বপত্র অর্থাৎ বেলপাতা আবশ্যিক। ২৬টি জিনিস মায়ের পায়ে ছুঁইয়ে পবিত্র করা হয়।
৪)নবপত্রিকা স্নান: মহাসপ্তমীর সকালে এই আচারটি পালিত হয়। নবপত্রিকার আক্ষরিক অর্থ ‘নয়টি পাতা’।
যদিও বাস্তবে ন’টি গাছের পাতার সঙ্গে শিকড়ও থাকে। এগুলি হল কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, দাড়িম, অশোক, মান ও ধান। একটি কলাগাছের সঙ্গে অপর আটটি উদ্ভিদের শিকড় ও পাতা বেঁধে দেওয়া হয়। অপরাজিতা লতা দিয়ে এই বাঁধুনির কাজ করা হয়। তার পর লাল পাড়ওয়ালা সাদা শাড়ি জড়িয়ে তাকে ঘোমটাপরা বধূর আকার দেওয়া হয়। সিঁদুর পরানো হয়। নবপত্রিকার প্রচলিত নাম হল ‘কলাবউ’।
৫)কুমারী পুজো: অবিবাহিতা কন্যাকে মহাশক্তি রূপে আরাধনা করা হয় কুমারী পুজোয়। কুমারীকে গঙ্গা জলে শুদ্ধ করে লাল শাড়ি পরানো হয়। পায়ে থাকে আলতা। অষ্টমীতে কুমারী পুজো হয়।
৬)সন্ধি পুজো: দুর্গা পুজোর খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। মহাষ্টমী ও মহানবমীর সন্ধিক্ষণে এই পুজো হয়, তাই একে বলা হয় ‘সন্ধি পুজো’।
মহাষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট এবং মহানবমীর প্রথম ২৪ মিনিট অর্থাৎ ৪৮ মিনিট ধরে চলে সন্ধি পুজো। ১০৮টি পদ্ম এবং ১০৮টি মাটির প্রদীপ সন্ধি পুজোর ক্ষেত্রে আবশ্যিক।
সন্ধি পুজোয় দেবী দুর্গাকে পুজো করা হয় চামুণ্ডা রূপে। যখন মহিষাসুরের সঙ্গে দেবী যুদ্ধ করছিলেন, সেই সময় চণ্ড ও মুণ্ড আক্রমণ করে। চণ্ড ও মুণ্ড ছিল মহিষাসুরের দুই সেনাপতি। এদের দুর্গা বধ করেছিলেন, সেই থেকে তাঁর নাম হয় চামুণ্ডা। চণ্ড ও মুণ্ডকে যে সন্ধিক্ষণে বধ করা হয়েছিল, তাকে স্মরণে রেখেই সন্ধি পুজোর আয়োজন করা হয়।
ছবি – বিধান শিশু উদ্যানে দূর্গা মায়ের মূর্তি।

