ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫। হোমিওপ্যাথি কেবল একটি চিকিৎসা-পদ্ধতি নয়—এটি একটি গভীর জীবনদর্শন, যেখানে রোগকে দেখা হয় লক্ষণ নয়, প্রবণতা হিসেবে, এবং চিকিৎসা মানে দমন নয়, রূপান্তর। এই দর্শনের কেন্দ্রে যে তত্ত্বটি সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে বিতর্কিত অথচ সবচেয়ে অপরিহার্য—তা হলো মায়াজম তত্ত্ব।
ডা. স্যামুয়েল হ্যানিম্যান যখন লক্ষ করলেন যে বহু দীর্ঘস্থায়ী রোগ লক্ষণগত চিকিৎসায় সাময়িক উপশম দিলেও বারবার ফিরে আসে, তখনই তিনি উপলব্ধি করলেন—রোগের দৃশ্যমান রূপের পেছনে আছে এক গভীর, অদৃশ্য, গতিশীল কারণ। সেই কারণই হলো মায়াজম।
মায়াজম : সংজ্ঞা ও দার্শনিক ভিত্তি
শব্দগত ও ধারণাগত অর্থ
‘Miasma’ শব্দের আক্ষরিক অর্থ বিষবাষ্প বা দূষণ। কিন্তু হ্যানিম্যানের হাতে এসে এটি রূপ নেয়—
একটি গতিশীল, বংশগত ও সুপ্ত রোগপ্রবণতা,
যা জীবনীশক্তিকে বিকৃত করে
এবং উপযুক্ত উত্তেজক পেলে রোগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
হ্যানিম্যানের মতে,
জীবাণু (bacteria/virus) রোগের exciting cause,
কিন্তু মায়াজম হলো fundamental cause।
এই কারণেই একই জীবাণুতে কেউ মারাত্মক অসুস্থ হয়, কেউ সামান্য আক্রান্ত হয়, আবার কেউ একেবারেই নয়—কারণ susceptibility আলাদা।
জীবনীশক্তি, বংশগতি ও মায়াজম
মায়াজম সরাসরি কোনো অঙ্গকে নয়, আঘাত করে জীবনীশক্তিকে।
এই জীবনীশক্তির বিকৃতি—
বংশপরম্পরায় প্রবাহিত হতে পারে
দমিত রোগের মাধ্যমে গভীরতর হয়
এক প্রজন্মে functional, পরের প্রজন্মে structural রোগ তৈরি করে ৷
ফলে একসময় রোগ আর শুধু “ব্যক্তিগত” থাকে না—তা হয়ে ওঠে পারিবারিক, সামাজিক ও প্রজন্মগত বাস্তবতা।
মূল মায়াজমসমূহ : প্রকৃতি ও প্রকাশ
হ্যানিম্যান তিনটি মূল ক্রনিক মায়াজমের কথা বলেন—
সোরা, সাইকোসিস ও সিফিলিস।
পরবর্তীকালে টিউবারকুলার মায়াজম সংযোজিত হয়।
১. সোরা (Psora) — অপর্যাপ্ততার মায়াজম
দার্শনিক প্রকৃতি
সোরা হলো আদি রোগবীজ—অপূর্ণতা, অভাব ও সংবেদনশীলতার প্রতীক।
মানসিক চিত্র
উদ্বেগ, ভয়, আত্মবিশ্বাসহীনতা
হাইপোকন্ড্রিয়াসিস
অতিসক্রিয় মন, কিন্তু স্থায়িত্বহীন ৷
শারীরিক প্রকাশ –
শুষ্ক ত্বক, চুলকানি, একজিমা
হজমের দুর্বলতা
অ্যালার্জি, অটোইমিউন প্রবণতা
ধীর নিরাময় ৷
সোরা = Functional disturbance
২. সাইকোসিস (Sycotic Miasm) — অতিরিক্ততার মায়াজম
উৎপত্তি
গনোরিয়ার দমনমূলক চিকিৎসা থেকে উদ্ভূত—
কিন্তু আধুনিক যুগে ভ্যাকসিনেশন, হরমোনাল দমন, দীর্ঘস্থায়ী ওষুধ ব্যবহারও সাইকোটিক প্রবণতা বাড়ায়।
মানসিক চিত্র
গোপনীয়তা, সন্দেহপ্রবণতা
নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা
স্মৃতির অসংলগ্নতা
আবেগের অতিরিক্ততা
শারীরিক প্রকাশ
আঁচিল, পলিপ, ফাইব্রয়েড, PCOS
জল জমা, শ্লেষ্মা বৃদ্ধি
হাঁপানি, সাইনুসাইটিস
অটোইমিউন ও অ্যালার্জিক অবস্থা
সাইকোসিস = Proliferation & Accumulation
৩. সিফিলিস (Syphilitic Miasm) — ধ্বংসের মায়াজম
দার্শনিক প্রকৃতি
যেখানে সোরায় অভাব, সাইকোসিসে অতিরিক্ততা—
সেখানে সিফিলিসে আছে ভাঙন ও বিনাশ।
মানসিক চিত্র –
গভীর বিষণ্ণতা
আত্মহত্যার চিন্তা
ধ্বংসাত্মক প্রবণতা
স্মৃতিভ্রংশ
শারীরিক প্রকাশ –
আলসার, গ্যাংগ্রিন
অস্থিক্ষয়, জন্মগত বিকৃতি
নিউরোলজিকাল রোগ
ক্যান্সার
সিফিলিস = Destruction
৪. টিউবারকুলার মায়াজম — অস্থিরতার মিশ্র রূপ
সোরা + সিফিলিসের সংমিশ্রণ।
বারবার সংক্রমণ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, restless mind—
আধুনিক জীবনের প্রতীক।
মায়াজমিক ক্রস ও মিশ্রতা
বাস্তবে কোনো রোগীই “একক মায়াজমে” সীমাবদ্ধ নয়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই থাকে—
Psoro-sycotic
Sycotic-syphilitic
Tubercular dominance
অভিজ্ঞ চিকিৎসকের কাজ হলো প্রধান মায়াজম শনাক্ত করা।
মায়াজম নির্ণয় : ক্লিনিক্যাল শিল্প
নির্ভর করে—
কেস ইতিহাস
পারিবারিক রোগ
মানসিক সাধারণ
শারীরিক সাধারণ
রোগের গতিপথ
ল্যাব টেস্টের ভূমিকা
ল্যাব টেস্ট মায়াজম নির্ণয় করে না,
কিন্তু মায়াজমিক প্রবণতা নির্দেশ করে।
মায়াজম
প্রধান ইঙ্গিত
সোরা – মাইল্ড প্রদাহ, অ্যানিমিয়া ৷
সাইকোসিস- ক্রনিক প্রদাহ, IgE ↑
সিফিলিস – প্যানসাইটোপেনিয়া, টিস্যু ড্যামেজ
অ্যান্টি-মায়াজম্যাটিক চিকিৎসা : কৌশল
মূল নীতি
লক্ষণ দমন নয়
জীবনীশক্তি পুনর্গঠন
গভীর থেকে উপরের দিকে আরোগ্য
ক্লাসিক ওষুধ
Psora: Sulphur, Psorinum
Sycotic: Thuja, Medorrhinum
Syphilitic: Mercurius, Syphilinum
প্রতিক্রিয়া
প্রাথমিক aggravation
পুরনো লক্ষণের প্রত্যাবর্তন
মানসিক উন্নতি আগে
আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা
আজকের—
অটোইমিউন ডিজিজ
সাইকোসোম্যাটিক রোগ
হরমোনাল ডিসঅর্ডার
মানসিক রোগ
সবই মূলত মায়াজমিক imbalance-এর আধুনিক রূপ।
উপসংহার
মায়াজম তত্ত্ব ছাড়া হোমিওপ্যাথি অসম্পূর্ণ।
এটি চিকিৎসককে শেখায়—
রোগ নয়, রোগীকে দেখতে ৷
লক্ষণ নয়, প্রবণতাকে বুঝতে ৷
আরোগ্যকে সময়ের গভীরতায় মূল্যায়ন করতে
মায়াজম হলো হোমিওপ্যাথির আত্মা।
একে বাদ দিলে চিকিৎসা হয় কেবল উপসর্গের খেলা।

