​হোমিওপ্যাথির ডায়েট-বিপ্লব: কফি, পেঁয়াজ ও কর্পূরের মিথ বনাম আধুনিক বিজ্ঞান….।

​হোমিওপ্যাথির ডায়েট-বিপ্লব: কফি, পেঁয়াজ ও কর্পূরের মিথ বনাম আধুনিক বিজ্ঞান….।

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫। ​হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা বিজ্ঞান কেবল লক্ষণভিত্তিক নিরাময় নয়, বরং এটি দেহের প্রাণশক্তি বা ‘ভাইটাল ফোর্স’-কে উদ্দীপিত করার এক সূক্ষ্ম কলা। দীর্ঘ দুই শতাব্দী ধরে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল যে, সামান্য কফি বা এক টুকরো কাঁচা পেঁয়াজ খেলেই বোধহয় ওষুধের গুণ নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আধুনিক গবেষণা এবং লক্ষ লক্ষ রোগীর ক্লিনিক্যাল ডেটা বলছে ভিন্ন কথা। হোমিওপ্যাথির কড়াকড়ি ডায়েট এখন আর ‘অন্ধবিশ্বাস’ নয়, বরং এটি ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুষ্টিবিজ্ঞান’ (Individualized Nutrition) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
​১. ঐতিহ্যের শেকড়: হ্যানিম্যানীয় বিধিনিষেধের ব্যবচ্ছেদ
​মহাত্মা হ্যানিম্যান যখন ১৮১০ সালে ‘অর্গানন অফ মেডিসিন’ লিখছিলেন, তখনকার সামাজিক ও চিকিৎসাগত পরিবেশ ছিল আজকের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেসময়ে তিনি ‘অর্গানন অফ মেডিসিন ‘ – এর ২৫৯- ২৬১ অনুচ্ছেদে পথ্য ও জীবনযাত্রার নিয়ম নিয়ে লিখেছিলেন ৷ এখন দেখা গেছে স্ট্রং মাউথওয়াশ বা মিন্ট বাম আমাদের ট্রাইজেমিনাল নার্ভকে উত্তেজিত করে ওষুধের সংকেতকে ব্লক করে দিতে পারে ৷ আবার তীব্র তেজস্ক্রিয়তা বা বৈদ্যুতিক চুম্বকীয় ক্ষেত্র( EMF) বা খুব গরম জায়গায় ওষুধ রাখলে খাবারের চেয়েও ওষুধের কাজে বেশি ক্ষতি করে ৷
​উদ্দীপক বর্জন: সেই যুগে মানুষ প্রচুর পরিমাণে ওষধি গুণসম্পন্ন মশলা, কড়া তামাক এবং উত্তেজক পানীয় গ্রহণ করত। হ্যানিম্যান চেয়েছিলেন ওষুধ চলাকালীন যেন শরীর কোনো বাহ্যিক ‘ওষধি’ প্রভাবে না থাকে, যাতে ওষুধের নিজস্ব ক্রিয়া স্পষ্টভাবে বোঝা যায়।
​সূক্ষ্ম মাত্রার সুরক্ষা: ৩০ বা ২০০-এর মতো সূক্ষ্ম শক্তির ওষুধগুলো যাতে তীব্র গন্ধের আড়ালে হারিয়ে না যায়, সেটাই ছিল মূল লক্ষ্য।
​বর্তমান বাস্তবতা: আজকের মানুষ যে হাইব্রিড খাবার বা পরিমিত কফি খায়, তার শক্তি হ্যানিম্যানীয় যুগের সেই উগ্র উপাদানের তুলনায় অনেক কম। ফলে আধুনিক চিকিৎসকরা মনে করেন, ওষুধের শক্তি এখন অনেক বেশি বাধা-সহনশীল।
​২.আধুনিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও মেটাবলিক স্টাডি সংক্রান্ত গবেষণার আয়নায় তথাকথিত “নিষিদ্ধ” খাবার নিয়ে হোমিওপ্যাথির এই ডায়েট-মিথ ভেঙে দিয়েছে।
​কফি ও ক্যাফিন বিতর্ক: একটি দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যারা নিয়মিত কফি পান করেন এবং যারা করেন না, তাদের ক্ষেত্রে ওষুধের কার্যকারিতার হার প্রায় সমান। তবে, Coffea Cruda বা Ignatia-র মতো ওষুধের ক্ষেত্রে কফি ব্যাঘাত ঘটাতে পারে কারণ এগুলোর উৎস বা ক্রিয়া কফির সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
​পেঁয়াজ ও রসুন: ইউরোপীয় এবং ভারতীয় কিছু গবেষণাগারে পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, কাঁচা পেঁয়াজের অ্যালিসিন (Allicin) নামক উপাদান ওষুধের আণবিক গঠনের কোনো পরিবর্তন ঘটায় না। আর সিদ্ধ বা রান্না করা পেঁয়াজ ও রসুন নিরাপদ ৷ ভারতের কেন্দ্রীয় বোর্ড (CCRH) স্পষ্ট করেছে যে, মুখের উগ্র স্বাদ ও গন্ধ যদি জল দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয়, তবে তা ওষুধের শোষণে কোনো বাধা দেয় না।
​ক্যাম্ফর (Universal Antidote): গবেষণায় দেখা গেছে, কর্পূরের অত্যন্ত শক্তিশালী ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক ফিল্ড বা উদ্বায়ী প্রভাব রয়েছে। এটি প্রায় অধিকাংশ উদ্ভিজ্জ ওষুধের ক্রিয়াকে নিস্তেজ করে দিতে পারে। আধুনিক গবেষণাও ক্যাম্ফরকে এড়িয়ে চলার পক্ষে মত দেয়।
​৩. মেকানিজম অফ অ্যাকশন: কেন গ্যাপ রাখা জরুরি?
​আধুনিক বায়ো-কেমিস্ট্রি অনুযায়ী, হোমিওপ্যাথিক ওষুধ মূলত মুখগহ্বরের নার্ভ এন্ডিং বা স্নায়ুর প্রান্ত দিয়ে কাজ শুরু করে।
​৩০ মিনিটের নিয়ম: যদি মুখে তীব্র মশলা বা কফির স্বাদ লেগে থাকে, তবে স্নায়বিক রিসেপ্টরগুলো ওষুধের সূক্ষ্ম সঙ্কেত গ্রহণে বিভ্রান্ত হতে পারে।
​শোষণ ও লালা: লালার pH মান বজায় রাখা জরুরি। অত্যন্ত টক বা অতিরিক্ত ঝাল খাবার মুখের pH পরিবর্তন করে দেয়, যা ওষুধের শোষণে সামান্য প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আধুনিক নিয়ম হলো—খাবার ও ওষুধের মাঝে ২০-৩০ মিনিটের ব্যবধান।
​৪. আধুনিক ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন: রোগ-নির্ভর ডায়েট
​বর্তমান সময়ের দায়িত্বশীল হোমিওপ্যাথরা ওষুধের জন্য খাবার না কমিয়ে, রোগের জন্য খাবার নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেন (Medical Nutrition Therapy)।

আমার সহকারী , নবীন চিকিৎসক বন্ধু ও হোমিও সচেতন রোগীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে একজন কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন হোমিওপ্যাথ চিকিৎসক হিসাবে জানাই থুজা (Thuja) এবং সালফার (Sulphur)-এর মতো গভীর ক্রিয়াশীল ওষুধের বিশেষ উল্লেখ করে , আধুনিক গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুবিশাল গবেষণামূলক প্রবন্ধ তাঁদের জন্য উপস্থাপন করছি।
​হোমিওপ্যাথির ডায়েট-নীতি: প্রাচীন সংস্কার বনাম আধুনিক বিজ্ঞান।।

থুজা ও সালফারের বিশেষ বিশ্লেষণসহ একটি তথ্যবহুল গবেষণা
​ভূমিকা:- হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় খাদ্যাভ্যাস ও ওষুধের ক্রিয়ার সম্পর্ক নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ১৮ শতকে ডঃ স্যামুয়েল হ্যানিম্যান যখন এই পথপ্রদর্শক চিকিৎসা পদ্ধতি প্রবর্তন করেন, তখন তিনি জীবনযাত্রার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তবে বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল এবং মেটাবলিজম স্টাডি বলছে, সব নিষেধাজ্ঞা সর্বজনীন নয়। মূলত ওষুধের প্রকৃতি এবং রোগীর ব্যক্তিগত সংবেদনশীলতার ওপর ভিত্তি করেই বর্তমান ডায়েট-চার্ট তৈরি করা হয়।
​১. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও বৈজ্ঞানিক যৌক্তিকতা
​হ্যানিম্যান তাঁর ‘অর্গানন অফ মেডিসিন’–এর ২৫৯-২৬১ অনুচ্ছেদে পথ্য ও জীবনযাত্রার নিয়ম বর্ণনা করেছেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর কারণ হলো:
​রিসেপ্টর মেকানিজম: হোমিওপ্যাথিক ওষুধ মূলত স্নায়বিক উদ্দীপনার মাধ্যমে কাজ করে। মুখগহ্বরের মিউকাস মেমব্রেন এবং স্নায়ুপ্রান্তগুলো যখন কড়া স্বাদ বা গন্ধ দ্বারা আবৃত থাকে, তখন ওষুধের সূক্ষ্ম কম্পাঙ্ক (Frequency) শরীরের কোষগুলোতে পৌঁছাতে বাধা পায়।
​ফার্মাকোলজিক্যাল ইন্টারঅ্যাকশন: কিছু খাবার ওষুধের রাসায়নিক গঠনের পরিবর্তন না করলেও শরীরের জৈব-রাসায়নিক প্রতিক্রিয়ায় ওষুধের বিপরীত কাজ করতে পারে।
​২. সালফার (Sulphur): আধুনিক ডায়েট ও বিবিধ সতর্কবার্তা
​সালফারকে হোমিওপ্যাথির ‘কিং অফ অ্যান্টিসোরিক’ বলা হয়। এটি অত্যন্ত গভীর ক্রিয়াশীল এবং শরীরের মেটাবলিজমের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
​গবেষণার তথ্য: সালফার প্রয়োগের পর শরীরের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে এবং ত্বকের নিচের রক্ত সঞ্চালন বাড়ে।
​খাদ্য নিষেধাজ্ঞা ও যুক্তি: অতিরিক্ত গরম ও মশলাযুক্ত খাবার ৷ সালফার নিজেই একটি ‘উষ্ণ’ ওষুধ। গবেষণায় দেখা গেছে, সালফার চলাকালে অতিরিক্ত ঝাল বা গরম খাবার খেলে ত্বকের চুলকানি বা জ্বালাপোড়া বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে (Aggravation)।
​চিংড়ি ও সামুদ্রিক মাছ: এই খাবারগুলো হিস্টামিন নিঃসরণ বাড়ায়। সালফারের চর্মরোগ নিরাময় প্রক্রিয়ায় এটি সরাসরি বাধা সৃষ্টি করে।
​কফি: সালফার এবং কফির ক্রিয়া বিপরীতধর্মী। কফি সালফারের গভীর ক্রিয়াকে মাঝপথে থামিয়ে দিতে পারে (Antidote)।
​৩. থুজা (Thuja Occidentalis): সাইকোটিক মায়াজম ও খাদ্যের প্রভাব –
​থুজা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ যা শরীরের কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি (যেমন আঁচিল, টিউমার) রোধে কাজ করে। এর ডায়েট-নীতি অত্যন্ত বিশেষায়িত।
​কাঁচা পেঁয়াজ বিতর্ক: প্রাচীন মেটেরিয়া মেডিকা অনুযায়ী থুজা চলাকালে কাঁচা পেঁয়াজ নিষিদ্ধ। আধুনিক বিশ্লেষণ বলছে, পেঁয়াজের তীব্র এনজাইম থুজার সাইকোটিক শক্তি হ্রাস করতে পারে। তবে সিদ্ধ পেঁয়াজ বা রান্নায় ব্যবহৃত পেঁয়াজে কোনো বাধা নেই বলে আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত।
​চা ও কফি: থুজা রোগীদের শরীর এমনিতেই আর্দ্র অর্থাৎ জলীয় প্রভাবে সংবেদনশীল থাকে। অতিরিক্ত চা বা কফি স্নায়বিক উত্তেজনা বাড়িয়ে থুজার কাজকে ধীর করে দেয়।
​তৈলাক্ত ও চর্বিযুক্ত খাবার: গবেষণায় দেখা গেছে, থুজা চলাকালীন উচ্চ চর্বিযুক্ত খাবার মেটাবলিজমকে মন্থর করে দেয়, ফলে ওষুধের কার্যকারিতা ঈপ্সিত স্থানে পৌঁছাতে দেরি হয়।
​৪. আধুনিক গবেষণালব্ধ ফলাফল: কি বলছে বিজ্ঞান?
​গত কয়েক দশকে বিভিন্ন দেশে (বিশেষ করে ভারত, জার্মানি ও ফ্রান্সে) হোমিওপ্যাথিক ওষুধের ওপর খাবারের প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে:
​টাইম-গ্যাপ স্টাডি: এক গবেষণায় দেখা গেছে, ওষুধ খাওয়ার ১৫ মিনিট আগে ও পরে কিছু না খেলে ওষুধের কার্যকারিতা ৯৫% বজায় থাকে। অর্থাৎ, পেঁয়াজ বা কফি খেলেও যদি সঠিক সময়ের ব্যবধান (৩০-৬০ মিনিট) রাখা হয়, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওষুধের কোনো ক্ষতি হয় না।
​ক্যাম্ফর (Camphor) – একমাত্র প্রমাণিত বাধা: গবেষণায় দেখা গেছে, কর্পূর বা ক্যাম্ফরের তীব্র essential oil স্ট্রং ইলেকট্রো-ম্যাগনেটিক ফিল্ড ওষুধের সূক্ষ্ম আণবিক শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এগুলো শক্তিশালী উদ্বায়ী ও স্নায়ু উদ্দীপক এবংএটি থুজা, সালফার বা পালসেটিলার মতো গভীর ওষুধের প্রধান শত্রু।
​ক্যাফিন স্টাডি: একটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, যারা দিনে ১-২ কাপ কফি খান, তাদের ক্ষেত্রে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ কাজ করতে কোনো সমস্যা হয়নি। তবে ‘চেইন কফি ড্রিঙ্কার’-দের ক্ষেত্রে ওষুধের ক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
নাক্স ভমিকার ক্ষেত্রে – কফি , তামাক , এলকোহল ৷
নেট্রাম মিউর খেলে – মিন্ট , বেশি কফি ও এলকোহল ৷
ওপিয়াম রোগীদের – ক্যাম্ফর , কফি , ইপিকাক ব্যবহার এড়িয়ে চলা ভালো ৷
​৫. বর্তমান ডায়েট গাইডলাইন: যা সবার মানা উচিত ৷
আধুনিক হোমিওপ্যাথির মূল দর্শন হলো -” Diet should support the patient and the disease condition , not ritualistically protect the medicine “.এখন হোমিওপ্যাথি ওষুধের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় খাদ্যনিষেধ আরোপের পরিবর্তে রোগ নির্ভর ডায়েট ,যেমন উচ্চ রক্তচাপে -লবণ , ডায়াবেটিসে -চিনি এবং গ্যাস্ট্রিকে যথা সম্ভব চা-কফি নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয় ৷ হোমিওপ্যাথির শক্তি তার সূক্ষ্মতায় , আর আধুনিকতার শক্তি তার যুক্তিবোধে ৷ এই দুয়ের সমন্বয়েই এগিয়ে যাবে ভবিষ্যতের হোমিওপ্যাথি ৷

 

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *