সুদীপা চৌধুরী : মেদিনীপুর, ২০ জুলাই, ২০২৫। Period নিয়ে গত বছর একটি ছোট্ট গল্প লিখেছিলাম। আমাদের প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজের মতো পিরিয়ড ও নারীদের জন্য প্রত্যেক মাসেই একটি স্বাভাবিক বিষয়। আগেকার দিনে এই নিয়ে অনেক জটিলতার সৃষ্টি হতো। কিন্তু পৃথিবী এখন এতটা এগিয়ে গেছে মানুষ এখন অন্য গ্রহে পাড়ি দিচ্ছে তবুও কেন নারীদেরকে এই পিরিয়ড নিয়ে অদ্ভুত অদ্ভুত সমস্যায় পড়তে হয় তা সত্যিই জানা নেই। আর কোন মেয়ের পিরিয়ড হলে তার বাড়ির লোক ন্যাপকিন কিনতে যাবে না তাহলে কে কিনবে? মানুষের শরীর খারাপ জ্বর জ্বালা হলে তো ঘরের লোকেই ওষুধ পত্র কিনে এনে দেয়। যদিও পিরিয়ড কিন্তু কোন রোগ নয়। প্রয়োজনীয় জিনিস ঘরের লোক বা নিজেই কেনা হয়। তাহলে পিরিয়ডের ক্ষেত্রে এতো লুকোছাপা কিসের। দোকান থেকে প্যাড কালো প্যাকেটে মুড়িয়েই বা আনতে হবে কেন? এছাড়া অন্য লোকে দেখে নিলে বা পাড়াপড়শি দেখে নিলে কোন চুরি করা জিনিস নিয়ে যাচ্ছে কি? নাকি মেয়েদের পিরিয়ড হওয়া খুব অপরাধের বিষয়? আবার দোকানদারের কাছে কি ‘প্যাড আছে’ এই কথাটা বলতেই বা এতো লজ্জা কিসের? কোনো নেশার জিনিস তো চাওয়া হচ্ছে না। যখন নেশার পানীয় কিনতে বা বিভিন্ন মাদকদ্রব্য কিনতে লজ্জা লাগে না তখন একটা স্বাভাবিক কাজের জন্য মানুষের লজ্জা বোধ হয় কি অদ্ভুত চিন্তা ভাবনা।
আগেকার দিনে ছোট ছেলে মেয়েদের কাছ থেকে নারী শরীরের সবকিছুই ভীষণ আড়াল করা হতো। আর যে জিনিসটা আড়াল করে রাখা হয় তার প্রতি মানুষের curiosity বেশি জন্মায় এটাই স্বাভাবিক। তার জন্য নারীর শরীর দেখার প্রতি একটা আকর্ষণ বা লোভ ছোট থেকেই জন্মগ্রহণ করত তাদের মনে। পিরিয়ড হলে কোন কারনে জামা কাপড়ে দাগ লাগলে সেটা নিয়ে কটুক্তি অপমান হাসি এসব সহ্য করতে হয় মেয়েদের। একটা ছোট্ট ছেলে মেয়েকে যদি খুব অল্প বয়স থেকেই এসব ব্যাপারে সতর্ক করা যায় তাহলে কিন্তু বড় হয়ে সে নারীদেরকে শুধু ভোগ্য পণ্যের চোখে দেখতে অভ্যস্ত হবে না। সাথে সাথে ছোটো মেয়েদেরকে কোনটা ভালোবাসার আদর আর কোনটা অন্যায় ভাবে শুধু শরীর ছোঁয়ার অভিলাষা সেটাও জানানো অবশ্যই উচিত। আমার husband এর কাছে শুনেছি ওদের ইন্টার্নশিপ পিরিয়ডে যখন চিকিৎসার বিভিন্ন জিনিস তাদের শেখানো হতো তখন সেখানে নারীদের স্তন নিয়েও পড়াশোনা বা দেখানো হতো ওই সময়। কিন্তু ওদের মধ্যে সেটা দেখব বলে অন্য কোন বাজে চিন্তাধারা কাজ করত না।
সম্প্রতি এক বিখ্যাত মানুষের period এবং Good touch, Bad touch সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে অদ্ভুত backward চিন্তাভাবনায় এই নিয়ে কিছু লেখার মানসিকতা জন্ম গ্রহণ করলো। যেহেতু আমিও একজন নারী তাই স্বাভাবিক এই ধরনের অদ্ভুত কথাবার্তায় একটু তো সাড়া দেবোই।
**পিরিয়ড**
অংকের ক্লাস চলছে, অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড স্যার ক্লাস নিচ্ছেন । সবার মনোযোগ স্যারের বোঝানো বীজগণিতের (a-b) হোল কিউব এর ফর্মুলার দিকে, কিন্তু তৃষা কিছুতেই পারছে না মনোযোগী হতে। কি করে এমন হলো সে বুঝতো ও পারছে
না! বড্ড ছটফট করছে সে। কি করবে সে এখন ?
শরীরটা আনচান করছে , তলপেট টা থেকে থেকে মোচড় দিয়ে উঠছে। বড্ড অসহায় লাগছে তার নিজেকে। সাথে মিশেছে লজ্জা আর ভয়।
বসে থাকতেও পারছে না যে সে আর। অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড স্যারের নজর কিন্তু ক্লাসের প্রত্যেকটা ছাত্র ছাত্রীর দিকে ঘোরাফেরা করে। পড়া বোঝাতে বোঝাতেই তিনি কিন্তু হঠাৎ করে প্রশ্ন করে বসেন, দেখেন ছাত্রছাত্রীরা কতটা মনোযোগী ।
বোর্ডে ফর্মুলা বিশ্লেষণ করার পর ছাত্র-ছাত্রীদের দিকে ঘুরে তিনি জানতে চাইলেন সবাই বুঝতে পেরেছে কিনা?
সবাই মাথা নাড়লে তিনি নিশ্চিত হয় চেয়ারে বসতে যান কিন্তু খেয়াল করেন তৃষা বেশ ছটফট করছে এবং স্যারের প্রশ্নের সে কিন্তু উত্তরও দেয়নি। চেয়ারে বসে তিনি তৃষা কে উঠে দাঁড়াতে বলেন এবং ফর্মুলা শটি বলতে বলেন। তৃষা ইতস্তত করে ,পারে না উঠে দাঁড়াতে । এ অবস্থায় স্যার বেশ বিরক্ত হন।
তৃষাকে ফের তার কথা রিপিট করেন এবং বলেন খাতা নিয়ে স্যারের কাছে আসতে।
এতে তৃষা আরো ঘাবড়ে যায়, সংকোচ করে।’এর আগে তো তৃষা কখনো এরকম করে নি’। স্যার চিন্তিত হন। ‘তৃষা পড়াশুনায় ভালো, কথার অবাধ্য হয় না, শান্ত মেয়ে কি হলো?’
হঠাৎ তৃষার পাশে বসে থাকা মনিকা বলে ওঠে ,’স্যার ও তো খাতায় কিছুই লেখেনি ওর খাতা দেখুন ফাঁকা’।
তখন স্যার বলেন ‘তৃষা তোমার কি সমস্যা বল? এভাবে সময় নষ্ট করো না’।
তৃষা কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই, কিই বা বলবে সে।
আড়ষ্ট হয়ে বসে থাকে ।
শুধু একবার অস্ফুটে বলে ওঠে, ‘ওঃ মা গো।’
পাশের বান্ধবী জিজ্ঞেস করে ‘কিরে তোর কি হয়েছে, শরীর খারাপ লাগছে?
নাকি তোর পেনের কালি শেষ হয়ে গেছে তাই লিখিস নি?’
তৃষা ঘাড় নেড়ে ‘না’ বলে।
স্যার এবার বেশ জোর গলায় বলেন, ‘তৃষা খাতা নিয়ে আমার কাছে উঠে এসো।’
চকিতে ভয়ে তৃষা খাতা নিয়ে উঠে দাঁড়ায় ।
দুধারে ডেস্ক চেয়ারে ভর্তি তার বন্ধু বান্ধবীরা ,মাঝখান দিয়ে তৃষা ধীর পায়ে হেঁটে যায় স্যারের কাছে।
কিন্তু হঠাৎই বেশ হাসাহাসির আওয়াজ শুরু হয়ে যায়।
ঠিক তৃষা যা ভেবে মনে মনে শিউরে উঠছিলো আর ভয় পাচ্ছিলো, তাই হোলো।
co-ed স্কুল, ছেলেরা তার দিকে তাকিয়ে হাসছে আর মেয়েরা মুখ টিপে মাথা নিচু করে। স্যার নিজের জায়গায় বসে এই অদ্ভুত ঘটনা লক্ষ্য করেন। কিন্তু তৃষা তার যে লজ্জা,ভয় , অপমান, বেদনা সব মিলে মিশে যেনো এক হাহাকারে পরিনত হয়েছে।
এ লজ্জা তৃষা এবার রাখে কোথায় ! মেয়েরা কি সত্যিই খুব দুর্বল? মেয়ে হয়ে জন্মানো কি কেবলমাত্র অভিশাপ?
স্যার অনাবশ্যক হাসির কারণ জানতে চেয়ে, সবাই কে চুপ করতে বলেন।
তৃষার সাদা খাতা দেখে স্যার জানতে চান, ‘কি হয়েছে তোমার তৃষা, আমায় খুলে বল? ‘
তৃষা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে, নিজের দুটি হাত কে একসাথে মুঠো করে। অভিজ্ঞ অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড মাস্টার মশাই বুঝতে পারেন কিছু একটা সমস্যা, কিন্তু তৃষা হয়তো বলতে চাইছে না । ক্লাসের সময় নষ্ট হচ্ছে এই ভেবে তিনি তৃষা কে নিজের জায়গায় গিয়ে বসতে বলেন।
তৃষা খাতা নিয়ে যখন চলে যায়, তিনি লক্ষ্য করেন , তৃষার স্কার্টের পিছনে লাল দাগ এবং তৃষার চলনের ইতস্তত ভাব।
এবার স্যার সবটা বুঝতে পারেন।
মাথাটা নীচু করে মিনিট খানেক থেকে হঠাৎ স্যার বলেন, ‘তৃষা তোমার ব্যাগ গুছিয়ে নাও, আমি তোমায় ঘরে ছেড়ে আসছি। হেড স্যারের কাছে আমি পারমিশন নিয়ে নিচ্ছি’।
ছেলে মেয়েরা কিন্তু তখনও নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করে যাচ্ছে, তৃষার দিকে তাকিয়ে।
স্যার জানিয়ে দেয় ‘আজকের ক্লাস এখানেই সমাপ্ত’ এবং বলেন , ‘ক্লাস এইট এর ছাত্র-ছাত্রী তোমরা ,এখনকার দিনে যথেষ্ট advance , সময়ের থেকে এগিয়ে থাকো, নিজেদের উন্নত broad minded বলে দাবি করো।
কিন্তু বলতে সত্যিই আমার খারাপ লাগছে তোমরা শুধু backdated ই নও, প্রচন্ড স্বার্থপর এবং অমানবিক। ছাত্রীদের উদ্দেশ্য বলি, বয়ঃসন্ধিকালের সমস্যা আর তার সাথে শারীরিক যন্ত্রণা ও মানসিক দূর্বলতা সম্পর্কে তোমরা কমবেশি সবাই অবগত। তবুও একজন বান্ধবী হয়ে আরেক বান্ধবীর পাশে না দাঁড়িয়ে এই ভাবে তাকে অপদস্ত করছো, যা কিনা তোমাদের প্রত্যেকটি মেয়ের জীবনের সাথে জড়িত তাই নিয়ে হাসাহাসি করছো ! কেমন মেয়ে তোমরা, কেমন বান্ধবী তোমরা! ছেলেদের বলেন ঘরে সবারই মা বোন দিদি রয়েছে। তারাও এই অবস্থার মধ্যে দিয়ে যান তাদেরও কষ্ট হয়। হয়তো তোমরা ঠিক বুঝতে পারো না, বোঝার কথাও নয় এ বয়সে। তাই আজ একটা কথা বলি, নারীদের পিরিয়ড বা শরীর খারাপ এর কারণেই কিন্তু তারা সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম হয়। তোমরা যথেষ্ট বড় হয়েছো এবং বিজ্ঞান বই, সমাজ মাধ্যম, টিভি, সব কিছুর দৌলতে তোমরা খুব ভালোভাবেই জানো একজন নারীর মা হওয়া ;তোমার আমার জন্ম এ সবের সাথে জড়িত কিন্তু নারীর এই পিরিয়ড। না এটা কোন রোগও নয় আর হাসির জিনিসও নয় ।
নারীদের সম্মান করতে শেখো। এটা তাদের দুর্বলতা নয় অক্ষমতাও নয়। এটা তাদের লজ্জা বা ভয়ের জিনিসও নয়।
এমনকি এখানে শুচি অশুচির ও কোনো প্রশ্ন নেই।
শুধু প্রয়োজন এই কারণে কোন নারী বিপদে পড়লে তার শরীরে যন্ত্রণা বাড়লে তার দিকে একটু সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেওয়ার ।হাসির কারণ জীবনে অনেক খুঁজে পাবে কিন্তু মানুষ হওয়ার কারণ মানুষের জীবনে খুব কমই আসে। তাই সেটার সদ্ব্যবহার করো। যদি তোমাদের কারো শরীর কোনো কারনে খারাপ হয়।
তখন যদি কেউ তোমাদের সামনে হাসে সেটা কি উচিত কাজ হবে? না তোমাদের ভাল লাগবে? নাকি কেউ সেই অবস্থায় তোমাদের দিকে সহানুভূতির হাত, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে তোমাদের ভালো লাগবে শশশ?তোমরা বসে ভাবতে থাকো আমি তৃষাকে ঘরে পৌঁছে আসি।
অংকের থিওরি , সায়েন্সের থিওরি প্র্যাকটিক্যাল তোমরা তো অনেক শিখবে, কিন্তু তার আগে মনুষ্যত্বটা শেখো ,মানুষ হতে শেখো তবেই ওই সার্টিফিকেটে পাওয়া ডিগ্রি গুলো জীবনে কাজে লাগবে নয়তো ওগুলো শুধু কাগজের টুকরো হয়েই রয়ে যাবে।’ স্যারের কথা শুনে তাদের মধ্যে চেতনার জাগরণ ঘটে,তারা চুপ করে মাথা নিচু করে বসে থাকে।
মনিকা চট করে তৃষার ব্যাগটা গুছিয়ে দিয়ে বলে ,’সাবধানে যা Sorry রে।’ স্যারের পিছন পিছন তৃষা এগিয়ে যায় আর মনে মনে ভাবতে থাকে মা যে এতদিন বলতো ‘এমন অবস্থায় কাউকে কিছু বলবি না, চুপ করে থাকবি, কষ্ট হলেও বলবি না, কেউ যেনো বুঝতে না পারে, বিশেষ করে ছেলেরা যেনো
একদম না টের পায়,জামায় রক্তের দাগ লাগলে, ছেলেরা জানতে পারলে ভয়ানক বিপদ। লজ্জার , অপমানের সীমা থাকবে না, মনে হবে এর থেকে মরে যাওয়াই ভালো।’
আর ঠাকুমা বলেন, ‘এই সময় ঠাকুর ঘরে যাবি না ঘরের কিছু ধরবি না, আমাকে ছুঁয়ে দিবি না,নিজের বিছানায় বসবি, অন্য কোথাও বসবি না।’
তারপর বিছানার চাদর বালিশের ওয়ার জামাকাপড় সবকিছু ধোঁয়া কাঁচা, যেনো ঘরে কোনো ছোঁয়াচে রোগ হয়।
অথচ স্যার একজন পুরুষ মানুষ হয়ে ও কতো ভিন্ন ধরনের মত প্রকাশ করলেন।
স্যারের বয়স হয়তো আমার বাবার বয়স থেকে ক্ষানিক কম, কিন্তু কই আমার বাবাও তো কোনদিন আমাকে এভাবে বোঝায় নি ।
বরঞ্চ সর্বদা এটা নিয়ে একটা আড়াল থেকেছে বাবার সাথে, আমি তো বাবার মেয়ে। স্যার তো বললেন এটা তো এক শারীরিক প্রক্রিয়া ,এর সাথে লজ্জা ঘৃণা ভয় এসবের সম্পর্ক থাকছেই বা কোথায় !
ঘরে পৌঁছে তৃষা ফ্রেশ হয়ে ,মাকে বলল, ‘মা পিরিয়ড বা শরীর খারাপ মেয়েদের এক অতি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এ নিয়ে অহেতুক মনে ভয় , লজ্জা এগুলোর স্থান দিও না।
বরঞ্চ নারীদের কাছে এ এক গর্বের ব্যাপার, কারণ এই জন্যই নারীরা মা হতে সক্ষম।
লজ্জা ঘৃণা ভয় পাওয়ার জন্য অনেক জিনিস রয়েছে ,যেগুলোতে আমরা পাই না, বরঞ্চ আজ থেকে সেদিকেই দৃষ্টিপাত করো ।আর হ্যাঁ আমার দাদাকে মানে তোমার ছেলেকেও শিখিও, নারীদের একটু সম্মান করতে। নারীরা কোন সময়ে পথে-ঘাটে এই নিয়ে বিপদ আপদে পড়লে যেন তাদেরকে বিদ্রুপ না করে বরঞ্চ সাহায্যের হাতটা বাড়িয়ে দেয়। ঠিক যেমন আজ আমার স্যার আমার দিকে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে, স্নেহের হাত বাড়িয়ে আমায় সাহায্য করলেন, আমার মনে জমে থাকা অকারণের ভয়কে দূর করলেন।
মেয়েদের পিরিয়ড কালীন রক্তের দাগ লজ্জার নয় । লজ্জার এই নিয়ে ভুল চিন্তাভাবনার অন্য মানুষের তাদের বিদ্রুপ করার এবং নারীত্বকে অকারণে আঘাত করার।

